কন্যা মুকুলের চোখে পিতা আরজ আলী

প্রকাশ: 30 May, 2021 1:12 : AM

বিধান সরকার : আরজ আলী মাতুব্বর। নানা চড়াই উতরাই পেড়ুনো জীবন। দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যবধানে নানা ভাবে চিত্রায়িত হন তিনি। তবে তার অনিসন্ধিচ্ছু মন আজো প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন অমন হৃদয়ে। লাইব্রেরী অন্তঃপ্রাণ এই মানুষকে ক্যামন দেখেছেন তার সন্তানদের মধ্যে একমাত্র জীবিত থাকা ছোট কন্যা বিয়াম্মা বেগম মুকুল, সে কথায় ফিরছি।

বাল্যে পিতার মৃত্যু, মাতৃস্নেহে বেড়ে ওঠা আরজ আলী মাতুব্বরের আরো দুই বোন ছিলেন। চাষাবাদ দিয়ে শুরু করেছিলেন তার কর্মজীবন। তবে শিক্ষকতাও করেছেন কিছু কাল। পরবর্তীতে করেছেন আমিনের কাজ। গ্রামের পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিছু ব্যতিক্রমী চরিত্রের মত আরজ আলী বিয়ের গীত এবং পুঁথি পাঠ করতেন। তিনি ছিলেন এসব দলের প্রধান ব্যক্তি। নিজ ভাগ্নে আবুল হাসেম মোল্লা ছিলেন এলাকার ভালো গায়ক। আরেক ভাগ্নেকেও পুঁথি পাঠ শিখিয়েছিলেন আরজ আলী,একথা ছোট কন্যা বিয়াম্মা বেগম মুকুলের বক্তব্য থেকে নেয়া। বাল্যকালে কষ্টর মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠলেও পরবর্তীতে পরিশ্রম করে বেশ সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন আরজ আলী। তবে একসময় নদী ভাঙ্গনের কবলে তার অনেক সম্পত্তি বিলীন হয়। তবুও অভাব কাকে বলে এর কোন প্রভাব ছোট বেলা থেকেই দেখেননি বিয়াম্মা বেগম মুকুল (৭০)।

মুকুল বলেন, তার দুই মা ছিলেন। প্রথম ঘরে ১ ভাই ১ বোন মিলিয়ে তারা ৩ ভাই এবং ৪ বোন। অপর তিন কন্যা সন্তানের মৃত্যু হয় শিশু বয়সে। মা দু’জন হলেও আজ অবধি তাদের মধ্যে কোন ভিন্নতা দেখা দেয়নি। বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বে উত্তর লামচরিতে মুকুলের মামাবাড়ি। নানা করিমউদ্দিন মৃধা ছিলেন ধনী ব্যক্তি। বটুয়া দিয়ে টাকা পয়সা মাপতেন। নিজ বাড়ির দরজায় স্কুল করেছিলেন করিমউদ্দিন। সেখানে আরো তিন জন শিক্ষক থাকলেও মাতুব্বরি ছিল আরজ আলী মাতুব্বরের হাতে। ওই স্কুলেই পড়তে আসতেন করিমউদ্দিনের ছোট কন্যা সুফিয়া বেগম। ধনীর বেটি, দেখতে বেশ এজন্য স্কুলের তিন শিক্ষকই সুফিয়া বেগমকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠান। একথা জানতে পেয়ে আরজ আলী মাতুব্বর একে একে তিন শিক্ষককেই স্কুল থেকে বিতাড়িত করেন। পরবর্তীতে বিপত্নীক আরজ আলী নিজে সুফিয়া বেগমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করেন করিমউদ্দিন মৃধা। প্রয়োজনবোধ করলে সুফিয়া বেগমের সৎ মা তাকে গিয়ে ধরেন আরজ আলী। করিমউদ্দিনের কাছে আরজ তোলেন-আপনিতো সব মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন নিজের পছন্দে, এবার ছোট কন্যার বিয়ে আমার পছন্দে দিতে চাই। কথা অনুযায়ী কাজ হলে সুফিয়া বেগমকে ঘরে তোলেন আরজ আলী।

আরজ আলী মাতুব্বর এবং তার দুই স্ত্রীর সংসারে জন্ম হয় মালেক, খালেক ও বারেক মাতুব্বর নামে তিন পুত্র সন্তানের। আর ফজিলাতুন্নেছা, মনোয়ারা বেগম কুসুম, নূরজাহান বেগম বকুল আর বিয়াম্মা বেগম মুকুল এই চার কন্যা মিলিয়ে মোট সাত সন্তানের জনক ছিলেন। ফুলের নামে নাম রেখে কন্যাদের ডাক নাম রেখেছিলেন। তবে বড় বোন ফজিলাতুন্নেছার ডাক নাম কোন ফুল দিয়ে রেখেছিলেন তা মনে আনতে পারছেন না মুকুল। মুকুল বলেন-তাদের ছোট বেলায় দেখেছেন বাবারা ছেলে মেয়েদের তেমন কোন আদর স্নেহ্ করতেন না। এক্ষেত্রে তার বাবা আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি ছেলে মেয়েদের বেশ আদর করতেন। এরমধ্যে তার মেঝ বোন মনোয়ারা বেগম কুসুমকে বেশী আদর করতেন। নেপথ্যের কারণ বলতে, কুসুম ছিলেন দেখতে আরজ আলীর মা রবেজান বিবির মতন। তবে ওসময় দূর গ্রামে স্কুল থাকায় মেয়েদের কাছছাড়া করেননি বলে তারা উচ্চ শিক্ষা নিতে পারেননি। তিনি পুত্রবধূদের দেখতেন নিজ কন্যার মত। তাদের গাছে উঠে ফল পেড়ে খেতে বলতেন। মেয়েদের সাথে পুত্রবধূদেরও নিয়ে যেতেন গানের অনুষ্ঠানে বা মেলায়, নতুবা দুর্গাপূজা দেখাতে। এনিয়ে আরজ আলী স্ত্রীকে বলতেন-তুমি পুত্রবধূদের কন্যার মত দেখলে তোমার মেয়েদেরও শ্বশুর বাড়ির লোকজন অমন চোখে দেখবেন।

বিয়াম্মা বেগম মুকুল তার পিতাকে দেখেছেন একজন হিসেবি মানুষ বলে। যেমন তিনি নিত্তি বানিয়েছিলেন, পাশের বাড়ি থেকে নুন ধার আনলেও যাতে কম না হয় তা নিত্তিতে মেপে দিতেন। মনযোগ সহকারের লিখতেন ও পড়তেন। ওসময় চুপিসারে তার কাছে গেলে টেরই পেতেন না আরজ আলী। শুধু কি তাই; কোন মানুষের কষ্ট হোক এমনটা কখনোই চাইতেন না। যেমন, বরিশালে রওয়ানা দিলে কখনো খেয়া নৌকা ছেড়ে গেলে তিনি মাঝিকে ডাকতে না। ওই খেয়ায় দ্রুত যেতে হবে এমন যাত্রী থাকতে পারেন বলে অপেক্ষা করতেন পরবর্তী নৌকার জন্য। এজন্য তিনি যে কোন কাজে সর্বদা আগে ভাগেই রওয়ানা করতেন। বিয়াম্মা বেগম মুকুলের স্বামী চাকুরী করতেন কুমিল্লায়। আরজ আলী মাতুব্বর ঢাকায় গেলে হাতে সময় থাকলে কুমিল্লায় যেতেন বটে;তবে তা দু-এক দিনের জন্য। থাকতে বললে বলতেন-সময়ের মূল্য বোঝ, আমার এখনো অনেক কাজ বাকী যে। তাইতো শেষের দিনগুলোয় প্রচুর পড়তেন এবং লিখতেন। তার আক্ষেপও ছিল বেশ লেখাগুলো শেষ করে যেতে পারবেন তো ?

আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন দর্শনটা ছিল এমন-ষাট বছর পর্যন্ত আয় করে যে সম্পদ গড়েছেন তা সন্তানদের জন্য। এর পরের টাকা বলতে চরের জমি বিক্রি করে জনকল্যাণে এখন থেকে ৪২ বছর আগে লাইব্রেরী গড়েছেন। এছাড়াও এলাকার সাত থেকে আটটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিতেন। এজন্য ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন। তবে তার মৃত্যুর পর পর্যায়ক্রমে শিক্ষা বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। লাইব্রেরীর অবস্থা বেহাল হলে জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল আলমের প্রচেষ্টা এবং জেলা পরিষদের অর্থায়নে তা ফের টিকে থাকার রূপ পায়। আর নগর পুলিশের কমিশনার এস এম রুহুল আমিন ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আরজ আলী স্মৃতি জাদুঘরের। আরজ আলী মাতুব্বরের নিজ বসত ঘরে স্থাপিত এই জাদুঘরের কার্যক্রম উদ্বেধন ফলকের সাথেই স্তিমিত অবস্থায়। বিয়াম্মা বেগম মুকুলে ইচ্ছা এসবের পুরোটা বাস্তবায়ন হোক। কেননা নিত্য পর্যটকদের পাশাপাশি চরমোনাই মাহফিলের সময় বেশ মুসুল্লিরা আসেন ব্যতিক্রমী চিন্তার নায়ক আরজ আলী মাতুব্বরের ভিটা দর্শনে। বিসর্জন দেয়া নখ ও চুলের সংরক্ষিত বাঁধানো কবর দেখতে।

আরজ আলী মাতুব্বরের পৈত্রিক নিবাস ছিল চরমোনাই ইউনিয়নের ঝর্ণাভাঙ্গা গ্রামে। নতুন প্রজন্মের অনেকেরেই অজানা এই গ্রামটি নিয়ে। তবে চরমোনাই ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর্জা আবুয়াল হোসেন জানালেন, ঝর্ণাভাঙ্গা গ্রামটি ছিল আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা কোড়ালিয়া নদীর তীর ঘেঁষা। নামী এই গ্রামটিতে অনেক বর্ধিষ্ণু পরিবারের বসতি ছিল। এমন এন্তাজ আলী মাতুব্বরের সন্তান ছিলেন আরজ আলী মাতুব্বর। তবে কোড়ালিয়া নদীর ভাঙ্গনে এই গ্রামটির বর্তমান অবস্থা কিছু ধানিজমি আর চার-পাঁচ ঘর বসতিতে ঠেকেছে। নদী ভাঙ্গনে সম্পত্তি বেহাত আর বাল্যে পিতার মৃত্যুর পর অভাবকে সঙ্গে নিয়ে অন্য নদী ভাঙ্গুলী পরিবারে সাথে বাঁচার তাগিদে মা রবেজান বিবি, শিশুপুত্র আরজ আলীকে নিয়ে নদীর আর পাড়ে দক্ষিণ লামচড়ি গ্রামে বসতি গাড়েন। তো যাই হোক; ফের মুকুলের কথায় ফিরি।

পিতা আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে তার যেমন গৌরববোধ আছে, তেমনি আছে আক্ষেপও। দীর্ঘ পচাঁশি বছরের এক্কেবারে শেষ দিনগুলোয় ফিরেন তিনি। জরা ব্যধিতে আক্রান্ত হলে মাস খানেক সময় ধরে বরিশালে এসে ইসাহাক মাতুব্বরের আবাসে থেকে বাবার সেবা করেছিলেন। মুকুলের মা সুফিয়া বেগমও তখন বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ বলে বাবাকে নিয়মিত ওষুধ খাওয়াতে ব্যতয় হবে, এই চিন্তা নিয়েই স্বামীর কর্মস্থল কুমিল্লায় ফিরতে হয় তাকে। বেশি অসুস্থ হলে আরজ আলী মাতুব্বরকে নেয়া হয় শেরেবাংলা মেডিকেলে। শয্যাশায়ী আরজ আলী ছোট কন্যা মুকুলকে দেখতে চেয়েছিলেন বলে, মুকুলের বোন চিঠি পাঠিয়েছিলেন। যেখানে লেখা ছিল- এই চিঠি টেলিগ্রাম মনে করে পাওয়া মাত্র চলে আসবে। সেই বেয়ারিং চিঠিখানি ৯ দিন পর কুমিল্লায় মুকুলের কাছে পৌঁছে। পর দিন লঞ্চযোগে রওয়ানা দিলে স্বপ্নে দেখেন বাবা আর নেই। যার অর্থ ওই চিঠি বিয়াম্মা বেগম মুকুলের হাতে পৌঁছানো সময় অর্থাৎ ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আমৃত্যু জ্ঞানের সন্ধানী আরজ আলী মাতুব্বরের। অমরত্ব লাভ করা দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের স্মৃতি চিহ্ন, তার সৃষ্টি যেন অটুট থাকে এমন কামনাই কন্যা বিয়াম্মা বেগম মুকুলের।

 

লেখক: বিধান সরকার, গল্পকার ও সাংবাদিক।