ইতিহাসে বরিশালের ঘূর্ণিঝড়

প্রকাশ: 30 May, 2021 12:50 : AM

শংকর লাল দাশ: ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশ সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় প্রবণ দেশ। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় প্রায়শঃ বাংলাদেশে বিশেষত উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। স্মরণাতীত কাল থেকেই এ অবস্থা চলে আসছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এ যাবত কত সংখ্যক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান করা যথেষ্ট পরিশ্রম সাধ্য কাজ। তবে প্রাণঘাতির দিক থেকে বিভিন্ন সময়ে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী বেশ কিছু ঘূর্ণিঝড় ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। সহায় সম্পদ ক্ষতির কারণেও বহু ঘূর্ণিঝড় ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে। প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে গত পাঁচ শতকে অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি ঘূর্ণিঝড় এতটাই প্রলয়ঙ্করী ছিল যে, তা ইতিহাসে ‘ভয়াবহ বা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

প্রাণহানির দিক থেকে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ঘূর্ণিঝড়টি ছিল ব্যাপক প্রলয়ঙ্করী। ওই ঝড়ে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে অন্তত দু লাখ মানুষ মারাযায়। যদিও তখন বরিশাল ‘বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ’ নামে পরিচিত ছিল। বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য। স¤্রাট আকবরের অন্যতম সভাসদ আবুল ফজল তার বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে এ ঘূর্ণিঝড়ের উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, আকবরের শাসনামলের ২৯ তম বর্ষের কোন একদিন বেলা তিনটার দিকে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বৃষ্টি ও বজ্রপাতসহ ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব চলে ৫ ঘণ্টা ধরে। ঘূর্ণিঝড়ে গোটা রাজ্য লন্ডভন্ড হয়ে যায়। চন্দ্রদ্বীপের রাজা জ্ঞানদানন্দ রায় সঙ্গী কয়েকজনকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে নৌকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল থেকে রক্ষা পাননি। রাজা জ্ঞানদানন্দ রায়ের ছেলে পরমানন্দ রায় পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে মন্দিরের উঁচু চূড়ায় উঠে প্রাণে রক্ষা পান। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসে রাজ্য এতটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছিল যে, পরবর্তীতে রাজা পরমানন্দ রায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এনে আবার জনবসতি গড়ে তুলেছিলেন।

১৭০৭ সালের ঘূর্ণিঝড়েও ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। ১৭৩৭ খ্রীস্টাব্দের ঝড়েও চন্দ্রদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চল বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। ধারণা করা হচ্ছে- ওই ঝড়ে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। কোন কোন সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, এমন ঐতিহাসিক বিবরণও রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সব ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে সুনামি বা ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। যেমন ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ছাড়াও বর্তমান বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জে বেশ কয়েকটি বিলের সৃষ্টি হয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৭৬৩ সালের ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পে একই ভাবে বর্তমান পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলায় রামপুর-চেচরি বিলের সৃষ্টি হয়।

১৭৮৭ সালের ঘূর্ণিঝড় বরিশাল অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাসে এক করুণতম অধ্যায়। ওই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াস এতটাই প্রলয়ঙ্করী ছিল যে, আড়িয়াল খাঁ নদের একটি শাখা খাল রাতারাতি মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে নদীর সৃষ্টি হয়। যা নয়া ভাঙ্গনী বা হরিনাথপুর নদী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সামুদ্রিক এ জলোচ্ছ¡াসে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ অঞ্চলের খেত-খামারের সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায় এবং স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। সরকারি হিসেবে ওই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসে ৬০ হাজার মানুষ মারা যায়। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। পরবর্তী সময়ে দুর্ভিক্ষেও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ১৭৮৭ খ্রীস্টাব্দের এ ঘূর্ণিঝড়ে তৎকালীন ইদিলপুর পরগণার দুই তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। এতে বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়ে। জনশূন্য এ অঞ্চল এক পর্যায়ে গভীর অরণ্যে রূপ নেয়।

১৭৬৯, ১৮২২, ১৮৬৪ ও ১৮৭৬ সালের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছাসেও এ অঞ্চলের বহু জনপদ ধ্বংস হয়। প্রাণহানি ঘটে অসংখ্য মানুষের। পরবর্তীতে ১৮৮২, ১৯০৯, ১৯১৯, ১৯৪১, ১৯৫৮, ১৯৬১ ও ১৯৬৫ সালে ঘূর্ণিঝড়ে বরিশাল অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল।

১৮২২ খ্রীস্টাব্দের সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়টি ইতিহাসে ‘১২২৯ সনের বন্যা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কারণ ১২২৯ সনটি ছিল বাংলা সন। ওই সময়ে মানুষ বাংলা সনের সঙ্গে বেশি পরিচিত ছিল। ওই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসে সরকারি একটি প্রতিবেদনে বরিশাল অঞ্চলে ২০,১২৫ জন পুরুষ ও ১৯,৮১৫ জন নারী অর্থাৎ মোট ৩৯,৯৪০ জন মারা গিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হিসেবের বাইরে খলসাখালী, যা বর্তমানে গলাচিপা উপজেলায় ২২,৪২২ এবং বাউফল উপজেলায় ১০,৯৮৪ জন মারা যায়। এ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের বর্ণনা রয়েছে ওই সময়ে বাউফল থানায় কর্মরত এক দারোগার প্রতিবেদনে। তিনি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ৬ জুন দুপুরে ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়। রাত ৯ টায় তা তীব্র আকার ধারণ করে। বহু মানুষ ও গবাদিপশু জলোচ্ছাসে ভেসে গেছে। পরেরদিন ঝড় থামলেও পরবর্তী সাতদিন ঝড়ো হাওয়া ছিল। ঝড়ে বাউফলের ৬৩টি গ্রাম বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এশিয়াটিক জার্নালের হিসেবে ওই ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এক লাখ মানুষ মারা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। মনপুরা ও হাতিয়া দ্বীপ পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে পড়ে।

১৮১৭, ১৮১৮, ১৮২২, ১৮২৫, ১৮৩২ এবং ১৮৫৫ সালের সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়েও বরিশাল অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। ১৮২৫ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এতটাই ব্যাপক সংখ্যক মানুষের প্রাণহাণি ঘটে যে, ধারণা করা হচ্ছে-এতে বরিশাল অঞ্চলের খাল, বিল, নদী, নালার পানি দুষিত হয়ে পড়েছিল। যে পানি ব্যবহারের কারণে মহামারি আকারে কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে ২৪ হাজার ৫০ জন মানুষের মৃত্যু হয়।

১৮৩২ সালের সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছিল ৬ জুন সন্ধ্যার দিকে। যার বিস্তৃতি ছিল চট্টগ্রাম উপকূল পর্যন্ত। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আসা জলোচ্ছাস হাতিয়া দ্বীপে একটি প্রাণীও বেঁচে ছিল না। ১৯৬৯ সালের সামুদ্রিক জলোচ্ছাসটিও ছিল প্রলয়ঙ্করী। এতেও বহু মানুষ ভেসে গিয়েছিল। এর একমাস পর আরও একটি জলপ্লাবন আঘাত হানে। পর পর দু’টি জলপ্লাবনে দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক শষ্যহানি ঘটে। যার প্রেক্ষিতে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয় এবং বরিশাল অঞ্চলে দশভাগের এক ভাগ মানুষ মারা যায়।

বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চলে ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর রাত দশটা থেকে তিনটা পর্যন্ত একটানা আঘাত হানা সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে আড়াই লাখ মানুষ মারা যায়। ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে ৪০ ফুটেরও উচু সামুদ্রিক জলোচ্ছাস বয়ে যায়। ওই ঘূর্ণিঝড়ের প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তীতে কলেরা ও দুর্ভিক্ষ মহামারী আকার ধারণ করেছিল। এতেও লক্ষাধীক মানুষ মারা যায়। এ ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, নিহতদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা এতটাই বেশি ছিল, যা পরবর্তীতে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন সরকারী পরিসংখ্যানে পটুয়াখালীতে পুরুষ ও নারীর অনুপাত ৫৩:৪৭ এবং গলাচিপায় ৫৬:৪৪ এ দাঁড়ায়। তখন অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছে যে, এ অনুপাত সামাল দিতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে বিবাহযোগ্যা নারীদের নিয়ে আসা হয়। এ ঝড়ের আংশিক বিবরণ ওই সময়ের ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাতে ঘূর্ণিঝড়ের যে ভয়াবহতার চিত্র উঠে আসে, তা রীতিমতো উদ্বেগ ও আতঙ্কজনক। এ ঘূর্ণিঝড়ে অনেক ব্রিটিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীও মারা যান। বাউফলের সাব-রেজিস্ট্রার ডি সিলভা আরও আটজনকে সঙ্গে নিয়ে তার অফিস চত্বরের একটা কাঁঠাল গাছে চড়েছিলেন। গলাচিপায় পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর জ্যাকসন তার স্ত্রী ও সন্তানসহ টিনের চালের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা কেউই প্রাণে রক্ষা পাননি। এরকম আরও কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক মারা যান।

বিশ শতকেও বরিশালসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এরমধ্যে ১৯১০ সালে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে বরিশাল অঞ্চলের কোন কোন এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হয়। ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও অনুরূপ আরেকটি ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। ১৯৬০ সালের পর বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যার প্রায় প্রত্যেকটি ছিল যথেষ্ট বিধ্বংশী। এরমধ্যে ১৯৬৫ সালের ১১ ও ১২ মে ঘূর্ণিঝড়ে বরিশাল অঞ্চলে সরকারি হিসেবে ১৬ হাজার ৪৫৬ জন মানুষ মারা যায়। ১৯৭০ সালের ১২ নবেম্বরের সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রলয়ঙ্করী। এতে অন্তত ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৯১ সালে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেড় লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তার আগে অপর এক ঘূর্ণিঝড়ে উড়িরচর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন, নারগিস, রেশমি, ক্যাটরিনা, রিটা, বিজলী, আম্পানসহ বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানে। যার প্রত্যেকটিতেই উপকূলীয় অঞ্চল কমবেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এসব ঘূর্ণিঝড় তাই জনইতিহাসের সঙ্গী হয়ে আছে।