গণহত্যার হিম ধরানো স্মৃতি কলসকাঠী

প্রকাশ: 16 May, 2021 11:57 : PM

বিধান সরকার : কলসকাঠীর গণহত্যা, স্বাধীনতা যুদ্ধের হিম ধরানো স্মৃতি। যে বেদনার স্মৃতি আজো বয়ে বেড়ান কারোর বাবা, কারোর বা স্বামী এবং স্বজন হারিয়ে। দিনটি ছিল ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ৩০ শে বৈশাখ, ১৯৭১ সালের ১৪ই এপ্রিল শুক্রবার। গানবোট নিয়ে চারদিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানী সেনারা হত্যা করেছিল ৩’শ ৬৫ জনকে। এরমধ্যে স্থানীয় ছিলেন ২’শ ৮৪ জন আর ৮১ জন ছিলেন ভিন এলাকার, স্বজনদের কাছে আশ্রয় প্রার্থী। অমানবিক এই গণহত্যাকান্ডের প্রধান হোতা মুসলিমলীগ নেতা বেবাজ গ্রামের ইসাহাক আলী হাওলাদার ওরফে প্রিন্সিপাল ইসাহাক। স্থানীয় দুই মুক্তিযোদ্ধার বয়ানে এমন তথ্য পাওয়া। আরো জানাগেছে, আশির কাছাকাছি বয়সের ইসাহাক আলী হাওলাদার ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে গা ঢাকা দেয়। বর্তমানে রাজধানীর উত্তরায় কখনোবা চট্টগ্রামে থাকে। এমন তথ্য দিলেন ইসাহাকের চাচাতো ভাই সোহেল হাওলাদার। বাড়ির স্বজনদের সাথে ইসাহাক আলী হাওলাদারের অতীতের কর্মকান্ডের জন্য কোন যোগাযোগও নেই। তার বসত ভিটা এখন বিরাণ ভূমি।কলসকাঠী এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামীলীগ নেতা আ. ছালাম মাষ্টার বলেন-১৯৭০ সালে কলসকাঠী কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। ওসময় কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ্যের দায়িত্ব পালন করেছিল ইসাহাক আলী হাওলাদার। শুরু থেকেই ইসাহাক মুসলিমলীগের নেতা ছিল। ইসাহাকের সাথে ছোটবেলায় বেড়ে ওঠা একই গ্রাম বেবাজের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইমান আলী (৭৬) বলেন, কলসকাঠী গণহত্যার দিন সকালে ইসাহাক আলী হাওলাদার তাদের সাবধান করেছিল, আজ পাকিস্তানী সেনারা আসবে। তাদের ন্যায় যুবক বয়েসীদের বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলেছিল। একথা বলে কলসকাঠী বাজারের পানে চলে যায় ইসাহাক। সেদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা অবধি চার শতাধিক পাকিস্তানী সেনা হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল।সুবিধাবাদীরা এখন পুরোটা বর্ণনা করতে চায় না বলে একটু পেছনের পানে ফিরি। ২০১০ সালের কোন একদিন কলসকাঠীর গণহত্যা বিষয়ে জানতে গিয়ে কথা হয় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেঁচে যাওয়া পাল পাড়ার অমূল্য চন্দ্র পাল (যিনি গত হয়েছেন ২০১৩ সালে) এবং বেবাজ গ্রামের নিরঞ্জন অধিকারীর সাথে। একই দিন আউলিয়াপুরের গোলাম মোস্তফার সাথে কথা হলে বলেন- ১৪ মে সকালে তুলাতলী নদী পথে সাহেবগঞ্জ লঞ্চঘাট পেড়িয়ে ৩ খানা গানবোট কলসকাঠীর পাড়ে বলতে পশ্চিম সীমানায় নোঙ্গর করে। আর পান্ডব নদী হয়ে কলসকাঠীর পূব সীমানা আঙ্গারীয়া নামক স্থানে ভিড়ে ২টি গান বোট। এনিয়ে অমূল্য চন্দ্র পাল বলেছিলেন- গণহত্যার আগের দিন বলতে বৃহস্পতিবার কুখ্যাত মুসলিমলীগ সমর্থক প্রিন্সিপ্যাল ইসাহাকের চ্যালা-চামুন্ডা, বেবাজ গ্রামের বক্স পাড়ার লতিফ বক্স, কালু বক্স, বাগদিয়ার বারেক মোল্লা, মজু তালুকদাররা কলসকাঠীর হিন্দু অধ্যুষিত পাল পাড়া, সাহা পাড়া, কর্মকার পাড়ায় বলে বেড়ায়- রোজ রোজ পালিয়ে থেকে কি লাভ? মিলিটারী যদি আসে তো, প্রথমে বাজারে আসবে। গুলির শব্দ বা পুল পেড়িয়ে আসার আগেই খবর পৌঁছে গেলে তখন না হয় বাড়ির পেছনের জঙ্গলে গিয়ে পালাতে পারবে অনায়াসে। এর আগে প্রতিদিন পাড়ার হিন্দুরা ভোর রাতে উঠে সন্তান,স্বজনদের নিয়ে দূর গ্রাম ডাপরকাঠী, বাগদিয়ার মুসলিম এলাকায় পালিয়ে থাকতেন। আবার সন্ধ্যে হলে তবেই ফিরতেন। কাজ নেই, কর্ম নেই; আয় রোজগার নেই। মরিচ ভাত খেয়ে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিয়েই দিন কেটেছে তখন। তবে ইসাহাক মিয়ার চ্যালাদের কথা অনুযায়ী যারাই থেকেছেন, তারাই মারা পড়েছেন। আর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বাড়ি ফিরে এসে নিরাঞ্জন সিকদারসহ ওই গ্রামের প্রায় সোয়া’শ ঘর হিন্দু স¤প্রদায়ের সদস্যরা পড়েন আরেক ঝামেলায়। এবার পাক বাহিনী নয়; স্থানীয় রাজাকার কালু বক্স ফরমান জারি করে, হিন্দু পাড়া থেকে ৪০ কাঠি চাল আর ৪০ কাঠি ডাল দিতে হবে। নতুবা কেউ এলাকায় থাকতে পারবেনা। তাই করতে হলো। চাহিদা অনুযায়ী চাল ডাল দিয়ে তবেই বাড়িতে থাকতে পারলেন তারা।তখন আ. ছালাম মাষ্টার শিক্ষকতা করতেন কলসকাঠীর বরদাকান্ত-মুক্তাকেশী (বিএম) একাডেমিতে। তিনি বলেন, পাক গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা ছিল হিন্দুরাই পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য যুদ্ধ করছেন। তাই পাক সেনারা মফস্বলে হিন্দুদের হত্যা ও মুসলমানদের রেহাই দিয়েছে শেল্টার পাওয়া জন্য। এই হিসেব অনুযায়ী কলসকাঠীর হত্যাকান্ডে কেবল হিন্দুদের মেরেছে। মুসলমান মারা যায়নি একজনও। আগুন লাগিয়েছে হিন্দু পাড়াতে। প্রথমে এসেই হত্যা করে খিরোদ চন্দকে। তিনি পাক সেনা দেখে খেই হারিয়ে লাফিয়ে ওঠে চিৎকার করে, বর্বরদের আগমনের খবর জানান দিচ্ছিলেন এলাকাবাসীকে। অমনি সময়ে তাকে গুলি করে হত্যা করা। এরপর একযোগে তুলাতলী নদীর খেয়াঘাটে, জমিদার বাড়ির সম্মুখে বর্তমানে যেখানে করা হয়েছে শহীদের উদ্দেশ্য স্মৃতি ফলক সেখানে এবং বাজারের খালের পাড়, এই তিন স্থানে পাকসেনারা চালায় মানুষ নিধন যজ্ঞ। সকাল ৮ টায় শুরু হওয়া হত্যাকান্ড চলে বিকেল ৫টা অবধি। তখন পাকসেনারা কলসকাঠী ছেড়ে বরিশালের উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়। আবদুস ছালামের মতে এই বর্বর ঘটনায় সাড়ে তিন থেকে চার’শ পাকিস্তানী সেনা অংশ নিয়েছিল।অমূল্য পালের স্ত্রী নব্বই পেড়–নো বৃদ্ধা মলিনা পাল সেদিনের বর্ণনায় বলেন, তারা বাড়ির পিছনের জঙ্গলে পালিয়ে ছিলেন বটে। তবে স্থানীয় রাজাকাররা দেখিয়ে দিলে তাদের পাকিস্তানী সেনারা খেদিয়ে এনে বিএম একাডেমীতে রাখে। আর পুরুষদের আলাদা করে রাখে চাউলা পট্টির ঘরে। নারীদের তল্লাশী করেছিল আর পুরুষদের ঘাটলার সামনে দাঁড় করায়ে হত্যা করে। আর শতেকের কাছাকাছি বয়েসি দুলু রানী সেন জানান,ঘটনার দিন তারা ছিলেন দৌড়ের উপরে। তার শ^শুড় ও দেবরকে হত্যা করে লাশ খালে ভাসিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানী সেনারা। মৃত্যুর এই বিভীষিকা তাদের তাড়িয়ে ফিরেছে অনেকটা বছর। যা এখনো মনে পড়লে আপ্লুত হন বর্ণনা কালে এমনটাই দেখা গেছে। গণহত্যায় স্বজন হারানো মুক্তিযোদ্ধা বাবুলাল সেনের বক্তব্য হলো- তাদের এখানে হত্যকান্ডে বরিশালে মুসলিমলীগ নেতা এবং শান্তি কমিটির সহ-সভাপতি শাজাহান চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। আর স্থানীয় পর্যায়ে ইসাহাক হাওলাদার রেখেছিল মুখ্য ভূমিকা। তার সাথে স্থানীয় আরো রাজাকাররা থাকতে পারে। তবে ইসাহাক আলী হাওলাদার ওরফে প্রিন্সিপাল ইসাকই ছিল মূল হোতা।

এবছরের ১৯ মার্চ ইসাহাক আলী হাওলাদার ওরফে প্রিন্সিপাল ইসাহাকের কলসকাঠী বাজারে যাবার পথে বেবাজ গ্রামের (ইয়াসিন হাওলাদার বাড়ি) বাড়িতে গেলে দেখা মেলে স্বজনদের। তবে ইসাহাক আলীর বসত ভিটা শূন্য পড়ে। তার ভাইয়ের ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেন রেজা বহু পীড়াপিড়ির পর কথা বলতে রাজী হন। ইসাহাকের অতীত কর্মকান্ড রেজার কাছে নৈতিকতা বিরোধী মনে হয় বলে রাজধানীতে থাকলেও কোন যোগাযোগ রাখেন না। ইসাহাক আলী হাওলাদার তার দুই ছেলে নিয়ে রাজধানীর উত্তরাতে বাস করে। আর ইসাহাকের চাচাতো ভাই সোহেল হাওলাদার (৩৭) কেবল তার ছোট বেলায় এই বাড়িতে ইসাহাককে আসতে দেখেছেন। মাঝে মধ্যে গ্রামের কোন কোন লোকদের সহায়তা করলেও তাদের বাড়ির সাথে যোগাযোগ নেই। নেই ইসাহাক হাওলাদারের মুঠোফোন নম্বরও তাদের কাছে।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ছুঁয়েছে। কলসকাঠী বিভিষীকাময় গণহত্যার বয়সও অমন বলে পুরানো বিষয় নিয়ে অনেকেই সামনে বাড়তে চান না। কেবল জমিদার বাড়ির আঙ্গিনায় স্মৃতি বিজড়িত নাম ফলক আছে মাত্র। লেখা আছে কিছু শহীদদের নাম, তাও এখন অস্পষ্ট। বছর পাঁচেক হলো বন্ধ আছে গণহত্যার দিবসটি ঘিরে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান এবং কাঙ্গালী ভোজেরও। তারপরও একই দিনে ৩’শ ৬৫ জন লোককে হত্যায় যাদের বাবা বা স্বজন হারিয়েছেন তাদের মনের ইচ্ছাটা হলো, কলসকাঠী হত্যাকান্ডের হোতা ইসাহাক আলী হাওলাদার ওরফে প্রিন্সিপাল ইসাহাককে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।