লবনাক্ত হয়ে উঠেছে কীর্তণখোলার পানি (ভিডিওসহ)

প্রকাশ: 5 April, 2021 10:24 : PM

বরিশালের কীর্তণখোলা নদীর পানি এক মাসের ব্যবধানে বেশ লবনাক্ত হয়ে উঠেছে। নদী পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ এই পানি পূর্বে ব্যবহার করতে পারলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে নদীর মিঠা পানি এখন লবনাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে করে জল জীবন এবং নদীর বাস্তুসংস্থানে বিরুপ প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি মাছ শূণ্য হওয়ার সাথে সাথে এই নদীর পানি ব্যবহারকারিরা ভুগতে পারেন নানা অসুখে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কীর্তণখোলা নদীর পানির ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাকটিভিটি স্বাভাবিক থাকলেও মার্চ মাসে বেড়ে যায় কয়েকগুন। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের শংকা রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সপ্তাহ আগে থেকেই কীর্তণখোলা নদীর পানি হঠাৎ করেই লবনাক্ত হয়ে ওঠে। পানি খেয়ে স্থানীয়রা লবণ স্বাদ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সোরগোল শুরু হয়।

কীর্তণখোলা নদী সংলগ্ন নগরীর ডিসি ঘাট এলাকার চা দোকানী মো: সোহেল বলেন, ৫/৭ দিন আগে থেকেই এই সমস্যা শুরু হয়েছে। পানি খাওয়া যাচ্ছে না, গোসলও করা যাচ্ছে না। মানে পানি ব্যবহারই করা যায় না। এই পানি দিয়ে আগে চা বানাতাম কোনো সমস্যা ছিলো না। এখন কাস্টমাররা চা তে স্বাদ পায় না। বলে লবন লবন লাগে।

কেডিসি কলোনীর বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, এই নদীর পানির উপর ভরসা কইরাই চলতে হয়। কিন্তু পানি লবন স্বাদ হইয়া যাওয়ায়। এই পানি দিয়া থালা বাসন ধোয়া ছাড়া কিছু করা ঠিক না হইলেও এখন এই পানি দিয়াই সব করতে হয়।

মোসলেম রহমান বলেন, হঠাৎ কইরা জোয়াড়ের পর হইতেই এই সমস্যা। আমি এহানে ৫০ বছর থাকি। কীর্তণখোলার পানি জীবনেও লবন হইতে দেহি নাই। এই পানি মিঠা পানি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম বলেন, ২০১০ থেকে ১২ সালে আমরা একটা সার্ভে করছিলাম। সেই সার্ভেতে উঠে আসে যে তেঁতুলিয়া নদী পর্যন্ত সাগরের পানি শুষ্ক মৌসুমে চলে আসে। তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলেছিলাম যে বিষয়টা নিয়া আপনারা একটু ভাবেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা শুনছি কীর্তণখোলা নদীর পানি লবনাক্ত হয়ে উঠেছে। এটার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও উদ্যেগ নিতে হবে। এটার ব্যবস্থা নেয়া না হলে জলজ প্রানী ও নদী তীরবর্তী মানুষের নানা সমস্যা হবে। উজানের পানি প্রবাহ কমে আসছে। এখন থেকে ১০ বছর আগে উজান থেকে পানি আসতো দেড় থেকে ২ লক্ষ কিউসেক মিটার পার সেকেন্ড। এখন সেটা কমে এসেছে গবেষনায় দেখা গেছে। উজানের পানি কমতে থাকলে সাগরের পানির একটা চাপ বাড়তে থাকে। উজানের পানি প্রবাহ বাড়াতে হবে। তাহলে এই ধরণের সমস্যা হবে না। পাশাপাশি আমাদেরও সচেতন হতে হবে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূল বিদ্যা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, কীর্তণখোলা নদীর স্যালাইনিটি তিনগুন বেড়েছে দেখা যাচ্ছে। লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। খুলনায় লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণ চিংড়ি চাষ। কিন্তু এই অঞ্চলে তা হয় না তাই এই অঞ্চলে লবনাক্ততা বাড়ার কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না আসলে নদীর পানির উচ্চতা কমে যায়। পাশাপাশি সমুদ্রের পানিটা নদীতে চলে আসলে লবনাক্ততা বেড়ে যায়। এবারে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতও হয়নি। এই কারণে লবনাক্ততা বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছি। নদীতে লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রানীদের হ্যাম্পার হবে। বিশেষ করে ইলিশের উপর প্রভাব পড়তে পারে। তাছাড়া এই পানি পান করলে মানুষের কিডনি ড্যামেজ সহ নানা রোগ হতে পারে।

বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি বায়োকেমিস্ট মোঃ মুনতাসির রহমান বলেন, প্রতিমাসেই নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। সেই অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে পানিতে লবানাক্ততার যে পরিমান ছিলো তার থেকে কয়েকগুন বেড়েছে মার্চ মাসে। ৭ ফেব্রুয়ারি কীর্তণখোলা নদীর ৬টি স্পট থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে চরকাউয়া সংলগ্ন কীর্তণখোলা নদীর মাঝের পানি পরীক্ষা করে তাতে ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটি অর্থাৎ তড়িৎ পরিবাহিতা ছিলো ৩৩২ এবং ৩২১, বরিশাল নদী বন্দর সংলগ্ন কীর্তণখোলা নদী তীরের পানির ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটি ছিলো ৩২০ এবং নদী বন্দর সংলগ্ন নদীর মাঝ খানের পানি ছিলো ৩১৪। দপদপিয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকায় নদীর পানির ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটি ছিলো ৩৪০ ও ৩২৪। ফেব্রুয়ারি ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটির পরিমান এমন থাকলেও মার্চ মাসে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় তা। মার্চ মাসের ৭ তারিখ পানি পরীক্ষা করে দেখা যায় নদী বন্দর সংলগ্ন নদীর তীরে পানিতে ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটি ১৩৬০, নদীর মাঝে ১৩৬২ এবং চরকাউয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন নদীর তীরে ১৩৩১ এবং নদীর মাঝে ১৩৪২ ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটি।

তিনি বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম আমাদের যন্ত্রগত কোনো সমস্যা হতে পারে। তবে সেটা হয়নি। কয়েকমাস পূর্বে এমন সমস্যা হয়েছিলো পিরোজপুরের বলেশ্বর নদীতে। সেখানে এমন অবস্থা ছিলো তিন মাস। ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটি ১২০০ পর্যন্ত আমরা সাধু পানি বলতে পারি। তবে এটা ওভার হয়ে গেলে সেটা অনেক লবনাক্তই বলা হয়। আর লবনাক্ততা বাড়লে ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটিও বাড়তে থাকে।

বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুজ্জামান সরকার বলেন, প্রতি মাসেই বরিশাল বিভাগের ১৫টি নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। বরিশালে কীর্তণোখালা নদী কিন্তু অনেক অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। এই নদীতে এমন সমস্যাটা কিন্তু এলার্ম হিসেবে ধরে নেয়াটা ভুল হবে না। আমরা বিষয়টি আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষর কাছে অবহিত করবো। নদীর কোনো স্থানে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে মনে করছি। সেই কারণেও এই ধরণের সমস্যা হতে পারে।

সূত্রঃ নিউজবাংলা

ভিডিও লিংক : https://youtu.be/rSrFjK2fnKE