ছোট গল্প: অনন্তকাল পরে বন্ধুর দেখা

প্রকাশ: 29 January, 2021 11:46 : AM

ছয় বছর বয়সে জয়ের ইচ্ছা ছিল। একটা গাছ লাগিয়ে তার কানে কানে বলেছিল, একদিন তোকে ঠিক দেখতে আসবো। চারাটা একটু বাঁকা হয়ে গেল। বাবা একটা কাঠি দিয়ে সোজা করে দিলেন। কেউ ওকে বুঝতে পারে না- বাবাই ওর বন্ধু ছিলেন। ডানপিটে বা দুষ্টু ছিল নাকো।

লেখাপড়া ভালো লাগত না। গাছ, পাখি-প্রজাপতি আর ফুলেদের সাথে খেলা ছিল ওর। যখন তখন শুনতে হতো, কিচ্ছু হবে না তোকে দিয়ে। বাবা বিশ্বাস করতেন- বড় হয়ে ঠিক হয়ে যাবে- সত্যিই তাই হলো। স্বপ্ন পূরণ হল মায়ের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুষদের কৃতি ছাত্র জয়। তার দেখা হল সমাজকল্যাণের ছাত্রী প্রীতির সাথে। ৭১ সালে জন্ম দুজনেরই সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয় ওরা। প্রীতি ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়েছে। সেজো আপা আর ভাইয়ার কাছে বড় হয়েছে ও। তাই সেজো আপাই ওর আদর্শ।

এরপর ওদের বিয়ে-সংসার। জয়ের বাবা জয়কে লন্ডন পাঠিয়ে দেন বার অ্যাট ল করতে। কিছুদিন পর প্রীতিও পাড়ি দেয় প্রবাসে। ওখানেই স্থায়ী হয়ে যায় জয় আর প্রীতি।
বাবা চলে যান না ফেরার দেশে। মা আর ছোট বোন কখনো প্রবাসে, কখনো ঢাকার পিংসিটির ডুপ্লেক্স বাড়িতে।

২০২০ সালে সে ঢাকায় এসে জয়ের মন চলে গেল সেই গাছটির কাছে, যশোরের পাটকেলঘাটা উপজেলার সেই থানা, যেখানে ৪২ বছর আগে কথা দিয়েছিল, একদিন ঠিক দেখতে আসব তোকে।

প্রীতিদের বাড়ি যশোর শহরে, দাদা বাড়ি পাটকেলঘাটা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কপোতাক্ষ নদীর ধারে। ওখানে ছেলেবেলা কেটেছে প্রীতির। গাড়ি ছুটে চলে রাস্তাটা খুবই খারাপ, ওসব জয়ের মাথায় নেই। জয় শুধু ভাবতে থাকে, কত বড় হলো আমার প্রিয় বন্ধু, নাকি কেউ কেটে ফেলেছে তাকে!

কিছুতেই মনে করতে পারছে না ওটা কি গাছ ছিল। জয়ের হৃদয়ে কে যেন ডেকে বলল, এসো বন্ধু আমি অপেক্ষায় আছি। এত দীর্ঘ পথ কেন শেষ হয় না যে! প্রীতি বলে, একটু পরেই পৌঁছে যাব।

সত্যিই এবার পৌঁছে গেল থানার সামনে কিন্তু এটাতো ২০১২ সালে নতুন করে আধুনিক থানার বিল্ডিং হয়েছে। জয়ের সবকিছু অচেনা মনে হলো। কপোতাক্ষ নদের একটি শাখা- স্রোত নেই, পানিও কমে গেছে, ঝির ঝিরে হাওয়া বইছে, মেঘ আর রোদের খেলা চলছে। জয়ের কিছুই ভালো লাগলো না খুব কান্না পেল। প্রীতির ও চোখে জল।

একজন প্রবীণ ভদ্রলোক জানালেন, থানার পুরাতন ভবন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে মাইলখানেক দূরে। কোন কথা না বলেই গাড়িতে উঠলো জয়। সবাই তার সাথে সাথে। গাড়িচালক বুঝেছিল কোথায় যেতে হবে। পুরাতন জীর্ণ ভবনের পাশে থামলো গাড়ি। সবার মন বিষাদে ভরা কি যেন হারিয়ে ফেলেছে অমূল্য রতন।

তেমন গাছ দেখা গেল না। একটা বকুল গাছ ফুল আর লাল ফলে ভরা ছিল। জয় ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল হঠাৎ দমকা হাওয়ায় ঝরালো বকুল রাশি রাশি। প্রীতি ওর হাত ছাড়েনি তো, দুজনেই বকুল সুবাসে সিক্ত হলো। এটাই হবে নিশ্চয়ই।

জয় দুহাতে জড়িয়ে ধরল গাছের গুড়ি টাকে। যেন অনন্তকাল পরে বন্ধুর দেখা পেল। সবাই বকুল ফুল উপহার নিল। কী জানি গাছটা কী বলেছিল জয় আর প্রীতিকে। শুরু হলো পথ চলা। গাড়ির শব্দ ছাড়া সব নিস্তব্ধ। সুবাসিত মন নিয়ে এবার ঘরে ফেরার পালা।

লেখক: কাজী লুৎফুন্নেসা, সাবেক সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ যশোর, সংগঠক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, যশোর