স্বামীর অবদানের স্বীকৃতি চান ঝর্ণা হালদার

প্রকাশ: 31 December, 2020 12:33 : PM

বিধান সরকার ॥ ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড়ানো ক্ষুধিরামকে দেখে প্রখ্যাত ভাস্কর রাম কিংকরের উক্তি ছিল, হাতে বোমা নেই কেন ? একই উক্তি মনে পড়লো এক ভাস্কর্য শিল্পী থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে বোমার কারিগর প্রয়াত চিত্ত হালদারের পোট্রেটের পানে চেয়ে। অনিয়ম, অনাচার আর বৈষম্য রোধে একদা সৃষ্টি ছেড়ে ধ্বংসে মেতে উঠলে এখন কেন নিবর চেয়ে থাকা! এখনো এর আধিক্য বিদ্যমান, যার বর্ণনা মেলে এই ভাস্কর্য শিল্পীর স্ত্রী ঝর্ণা হালাদারের কষ্টের দিনগুলোর মধ্যে। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত বলে কিছু পাওয়ার নেই এখন আর। তবে আক্ষেপ আছে স্বামীর অবদানের স্বীকৃতি নিয়ে। তিন যুগ ধরে এই লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে শ্রান্তির খোঁজে ভাড় তুলে দিয়েছেন সন্তানদের হাতে। শুনি স্বাধীনতা যুদ্ধে এক ভাস্কর্য শিল্পীর বোমার কারিগর হয়ে ওঠার নেপথ্যের ঘটনা এবং বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ও স্ত্রী-সন্তানদের বেড়ে ওঠার কষ্টের দিনগুলির কথা।

ঝর্ণা হালদার বললেন, ১৯৩৬ সালে তার স্বামী চিত্ত হালদারের জন্ম নগরীর অক্সফোর্ড মিশন রোডে। ১৯৫৮ সালে বিয়ে হয় তাদের দুজনায়। আর মাত্র ২০ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে ৪২ বছর বয়সে চিত্ত হালদারের লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। গুনধর স্বামীর কর্মের বর্ণনায় ঝর্ণা জানান, চিত্ত বাবু বাল্যে নিজ থেকেই ছবি আঁকতেন বেশ। যার ধারাবাহিকতায় একদা পেশা হিসেবে রং তুলিই হাতে নিলেন তিনি। নগরীর কালীবাড়ি সড়কে চিত্রালী নাম দিয়ে একটি ডেরায় ছবি আঁকার সাথে প্লাস্টার অব প্যারিসের ব্যাবহারে ভাস্কর্য নির্মাণ করতেন। বিশেষ করে সাকি ওমর খৈয়ামকে সুরা ঢেলে দিচ্ছেন, নতুবা কোন এক গাঁয়ের বধূ, হেলেন অব ট্রয় থেকে রাণী ক্লিওপেট্রা, পাথরের মধুবালা কত অনন্য সৃষ্টি ছিল তার। যা দেখতেন তাই তৈরী করতে পারেতেন বলে পটুয়া কামরুল ইসলাম বিশেষ ¯েœহ করতেন চিত্ত হালদারকে। কাজের ফাঁকে বিজ্ঞান ও কল্প কাহিনীর প্রচুর বই পড়তেন। এসময়ই হয়তোবা বোমা বানানোর এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন চিত্ত বাবু। যার বদৌলতে ৭ই মার্চের পর তার ডাক পড়ে ধর্ম রক্ষিনীতে মিন্টু বসুর সাথে তার তিন সহযোদ্ধা এনায়েত হোসেন মিলন, হেলালউদ্দিন ও সৈয়দ ওয়াহিদুজ্জামান কচি সমেত বোমা তৈরীতে। মলটেভ ককটেল, হাত বোমা, এসিড বোমা, ভাসমান মাইন এবং আকাশযান বিধ্বংসী রকেট বোমা বানায়ে ফেলেন তারা। যা ব্যবহৃত হয়েছিল চাঁদপুর ও খুলনার গল্লামারি এলাকার যুদ্ধে সাফাল্য অর্জনে। বোমা তৈরীর উপমায় ঝর্ণা হালদার বলেন, মার্চের কোন এক সন্ধ্যায় কচি বাসায় আসেন। ব্যাগে করে আনা ব্যাটারীর সেল ও যন্ত্রাশং কচির মাথায় তুলে দিয়ে আগে বাড়তে বললেন চিত্ত রঞ্জন। জিলা স্কুলের মাঠে এই বোম ব্লাস্ট করলে গগণ বিদারী আওয়াজ হয়। ফিরে আসা কচিকে কাঁদা মাখা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন ঝর্ণা হালদার।

এই করে ২৫ এপ্রিল বরিশালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ওয়াপদায় ক্যাম্প গাড়ে। বোমা বানানোর জন্য চিত্ত হালদারকে কালো তালিকা ভুক্ত করে এবং দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ জারি হয়। এমন দিনের এক রাতে সোনালী হলে ইংলিশ সিনেমা দেখছিলেন। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আ. মালেক মিয়া চিত্ত হালদারের সহপাঠি ছিলেন। তাকে শহর ছেড়ে পালাতে বললে কাউনিয়ায় কচিদের বাসা হয়ে বানারীপাড়া থেকে উজিরপুরের ধামসারে শ্বশুড় বাড়িতে ওঠেন। কন্যা জুলিয়েট, স্ত্রী ঝর্ণা হালদার ও বোন ইন্দুকে নিয়ে এখানে চিত্ত হালাদারের অবস্থান। এমনি দিনে বরিশাল নগরীর জিলা স্কুল সংলগ্ন পেট্রোল পাম্পের বিহারী দারোয়ানের ছেলে হাদিস, পাকিস্তানী সেনা নিয়ে চিত্ত রঞ্জনের সাবেহের গোরস্তান লাগোয়া আবাসে হানা দেয়। বৃদ্ধ মা তরনী হালদার মিলিটারী দেখে দৌড়ে পালাতে গিয়ে আছাড় খেয়ে দুটো দাঁত হারান। বাবা বিশ্বনাথ হালাদার (৮০) কে বলেন ছেলে কোথায় তা জানাতে, আর ছেলে বৌকে নিয়ে আসতে। এসময় হাদিস পাকিস্তানী সেনাদের উপস্থিতিতে বাসার মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয়। এরিমধ্যে একদিন বেলুচ থেকে সৈনিক হয়ে যুদ্ধে আসা খ্রীস্টান দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন মারা গেলে, চিত্ত রঞ্জনের বাবা বিশ্বনাথ হালদারকে দিয়ে সাহেবের গোরস্তানে সমাহিত করেন। লাশ তুলে নিতে পারে এই ভয়ে ওদিনই সমাধি ইট বালু দিয়ে পাকা করেন পাকিস্তানী সেনারা। ঠিকানা বিহীন যে সমাধি আজো বিদ্যমান সাহেবের গোরস্থানে। ফি বছর ২ নভেম্বর কবর প্রতিষ্ঠা দিবসে অন্য সমাধির সাথে ওই সমাধিতেও দ্বীপ জ্বালানো হয়।

এই অশান্ত সময়ের মধ্যে চিত্ত হালদার ফের বরিশালে ফেরেন। অনেক দিন ভাত খায়নি বলে ঘরে ফিরে মায়ের কাছে ডিম দিয়ে ভাত খাওয়ার অনুরোধ করেন। রাজাকার আর পাকিস্তানী সেনাদের উৎপাতে ছেলেকে মাচায় ওঠায়ে আব্দার অনুযায়ী ভাত খেতে দেন মা। এদিন কাজের মেয়ে মিনু আর ড্রামে করে এসিড আর পেট্রোল নিয়ে বাস যোগে ফরিদপুরের খাগবাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে পাকিস্তানী সেনারা গাড়ি চেক করবেন বলে যাত্রীদের নেমে যেতে বলেন। চিত্ত হালদার ড্রাম দুটি সিটের নীচে ঢুকিয়ে রাখায় সামনে থেকে চেক করে নেমে যাওয়াতে ঝঞ্ঝাট থেকে রক্ষা পান। এরপর গৌরনদী নেমে ভিন্ন পথে জীবন নিয়ে বোনের বাড়ি খাগবাড়িতে পৌঁছেন। এখানে অবস্থানের এক রাতে ডাকাত পড়ে। চিত্ত বাবু এবং ঘরে থাকা অন্যদের বেঁধে ফেলে। ডাকাতের রামদার কোপে ঝর্ণা হালদারের বা হাতের তালু কেটে যায়। ঝর্ণা হালদারের বর্ণনায়, ওসময় এক ডাকুর পা জড়িয়ে ধর্মের ভাই ডেকে মারধর করতে বারণ করি। যুবা বয়েসি ওই ডাকুর জবাব ছিল, ডাকুর বোন কান্না করো কেন, একটা খাটিয়া দেখায়ে বলে এখানে বসো। অন্য বাড়ি ডাকাতি সেড়ে ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো। অন্ধকার রাত, ডাকুরা চলে যাবার পর একটি দীঘির পাড়ে নেমে গাছ ধরে চুপটি করে আছি। এসময় দীঘির অপর পাড় থেকে ডাকাত বলে চিৎকার করে টর্চের আলোয় আমাকে দেখতে পেয়ে পাড়ে তোলেন স্বজনরা। এরপরই বলতে তখন ভাদ্র মাসে আমরা ভারতের পানে ছুটি। খ্রীষ্টান বলে বনগ্রামের অভয়াশ্রমে স্থান মেলে। এখানেই একদিন ক্যাপ্টেন হুদার সাথে দেখা হয়। তিনি ক্যাম্প থেকে চিড়া, গুড় ও ২ টি লুঙ্গি দিয়েছিলেন আমাদের। দমদমে ভাসুর নিরঞ্জন হালাদারের বাড়িতে অবস্থান করার সময় রাত ৮টা কি ৯টার সময় খবর পাই দেশ স্বাধীন হয়েছে। চিত্ত বাবু ছুটবেন স্বাধীন দেশের পানে, কিন্তু আমাকে ভারতে রেখে যাবেন। আমার মন মানে না, রেখে যাওয়া বৃদ্ধ শ্বশুড়, শ্বাশুড়ি সাথে বাড়ির মায়া যোগ হওয়াতে আমিও শিশু সন্তানদের নিয়ে ট্রেনে চেপে বসি। প্রচন্ড ভিড় ট্রেনে তিল ধারণের জায়গা নেই। চিত্ত বাবু, শোভা রঞ্জন বিশ্বাস ও এ্যন্টনীকে দেখতে পাই জায়গা না পেয়ে তারা ট্রেনে ঝুলে আসছেন। রাত তখন ১টা খুলনা স্টেশনে নামি। পরদিন সকাল ৮টায় স্টীমারে উঠে সন্ধ্যায় বরিশালে আসি। রিক্সাওয়ালা চিত্ত বাবুকে দেখে উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলেন-দাদা বেঁচে আছেন আপনি। চিত্ত রঞ্জনের স্বাধীন দেশে ফেরার নেপথ্যে তাগিদ ছিল একুশের সংকলন বের করবেন বলে। সেবার একুশের প্রভাত ফেরিতে সব নারী পুরুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে জানান ঝর্ণা হালদার।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বরিশালের পাট চুকিয়ে চিত্ত রঞ্জন হালদার ঢাকায় গিয়ে কাজ শুরু করেন। এখানেই পটুয়া কামরুল হাসান, ঢাকা যাদুঘরের পরিচালক ড. এনামুল হকের সঙ্গে আন্তরিকতা গড়ে ওঠে তার। ছয় বছর পর লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হলে অসুস্থ হয়ে বরিশালে ফেরেন। ১৯ জুলাই ১৯৭৮ এখানের শেবাচিম হাসপাতালে চিত্ত হালদারের মৃত্যু হয়। স্বামীর অকালে মৃত্যুতে তিন শিশু কন্যা নিয়ে ঝর্ণা হালদারের আরেক যুদ্ধে নামতে হয়। আঁচলে বাঁধা ৫টি টাকা সম্বল করেই স্বামীর ভাস্কর্য কর্মে হাত দেন তিনি। সহায়তা পেয়েছিলেন পটুয়া কামরুল হাসানের কাছ থেকে। ওই করে তিন কন্যা জুলিয়েট, ভায়লেট ও ব্রিজেন্টকে বড় করে তোলেন। বড় ও মেঝো কন্যা নরওয়ে প্রবাসী। ছোট কন্যা জামাতা নিয়ে তার সাথেই নগরীর সাহেবের গোরস্তান সংলগ্ন গোড়াচাঁদ দাস সড়কের আবাসেই থাকেন। কষ্টের অধ্যায় পেড়িয়ে আসায় এখন চাওয়ার কিছু নেই ঝর্ণা হালদারের। তবে আক্ষেপ আছে মুক্তিবার্তার ২৯ পৃষ্ঠায় ০৬০১০১০৭৬৬ যোদ্ধা নম্বর হিসেবে মি. চিত্ত রঞ্জন হালাদারের নাম থাকলেও স্বীকৃতি সনদ পাননি। এ যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে ঝর্ণা হালদার শ্রান্তির অপেক্ষায়। তাই চলে আসার সময় তার জিজ্ঞাসা ছিল মুক্তিযোদ্ধারা মারা গেলে গার্ড অব অনার দেয়া হয়; তাঁদের সহধর্মীনি মারা গেলে কিছুই কি করার নেই? কেননা স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনও ভাত রেধে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠিয়েছেন। ডাকাতের হামলা সয়েছেন আর সন্তানদের নিয়ে কষ্টের কঠিন দিনগুলি পাড় করেছেন যে। মনে মনে উত্তর খুঁজি এ প্রশ্নের সমাধানের দায় রাষ্ট্রের বৈ ভিন্ন কারো নয়।

লেখক: বিধান সরকার,গল্পকার।