‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ক্রসফায়ার কি কোন সমাধান?’

প্রকাশ: 11 October, 2020 12:35 : AM

মো: রেজা-উর রহমান রাজুঃ এক্সটা জুডিশিয়াল কিলিং কোন অপরাধ দমনে সমাধান হতে পারে না , যদি হত তাহলে আজকে আমাদের দেশে মাদকের এত ছড়াছড়ি থাকতো না। যারা এই দাবি তুলছেন প্রথমে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি আগে বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের কথা না হয় বাদই দিলাম। আপনি কি মনে করছেন এক্সটা জুডিশিয়াল কিলিংয়ে শুধুমাত্র অপরাধীরা মারা যাবে? এর উত্তর হবে অবশ্যই না, বাংলাদেশ এমন হওয়ার সম্ভবনা অনেক কম। বরং এতে অগনীত নিরীহ মানুষ মারা যাবে, হয়রানির শিকার হবে। তখন আবার আপনারাই প্রতিবাদে সরব হবেন। এর বহু নজির রয়েছে এদেশে। যেমন: ওসি প্রদীপ কুমার, কক্সবাজারের একরামসহ অনেক উদাহরণ আছে । যারা ধর্ষনের শাস্তি হিসাবে এক্সটা জুডিশিয়াল কিলিং চাচ্ছেন তারা কি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বুঝে দাবি করছেন? যদি এটা হয় দেশে প্রদীপ কুমারদের অভাব হবে না। বিনা বিচারে আপনিও এর আওতাভুক্ত হতে পারেন বিনাদোষে ।

বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতৃক অনেক সময় হয়রানির অভিযোগ পাওয়া যায় কিন্তু যদি কোন ভাবে সরকার আইন করে অথবা সংবিধান সংশোধন করে এক্সটা জুডিশিয়াল কিলিং বৈধতা দেয়া হয় তবে কি হতে পারে একবার চিন্তা করে দেখতে পারেন! শুধু একবার কল্পনা করে দেখুন অথবা যারা শুধু শুধু এই ধরনে ঘটনা ফেইস করেছেন তাদের অভিজ্ঞতা গুলো নেটে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন। আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা অনেকটাই ধীরগতিতে চলছে, আপনি কি মনে করছেন এর দায় শুধু বিচার বিভাগের? অবশ্যই না, কেননা বাংলাদেশের জনসংখ্যা এবং মামলা বিবেচনা যে পরিমান বিচারক ও আনুষাঙ্গিক ব্যবস্থা থাকা দরকার তা অধিকাংশ নেই বললেই চলে। আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে একটি পরিসংখ্যান দিচ্ছি- ১৮০০ বিচারকের কাঁধে ৩২ লাখ মামলার বোঝা দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও অন্যান্য মিলিয়ে বিচারাধীন রয়েছে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা। এর মধ্যে অধনস্তআদালতে বিচারাধীন এবং নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ। একেকজন বিচারকের হাতে গড়ে মামলা রয়েছে ১ হাজার ৭৫৮টি করে মামলা। এখন শুধু নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের একটা পরিসংখ্যান দেই-১৮ কোটি মানুষের দেশে নারী শিশু নির্যাতন মামলার বিচার করেন মাত্র ৯৫ টি ট্রাইবুনাল। সেটাও সরকার ২০১৬ সাল থেকে ৪১ জন বৃদ্ধির পরে । মামলা সংখ্যা ২ লাখের উপর। তারা আবার একই সাথে শিশু আদালতও। সেখানেও মামলা আছে ১৮ হাজারের মত। এই ৯৬ ট্রাইবুনালের অন্তত ২৩ টি বেশ কিছুদিন বিচারক শূন্য মানে ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে চলছে যার নিজের আদালতেই হয়তো ২ হাজার মামলা।

একটা আদালতে ২ হাজার মামলা থাকলে ভাবেন তো অবস্থা। অথচ আপনারা জেনে অবাক হবেন এদেশে বিচার বিভাগের থেকে বিটিভি বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ কারণ বিচার বিভাগের থেকে বিটিভর বাজেট বেশি, কি হাস্যকর ব্যাপার! আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা শুধু বিচারকের উপর নির্ভর করেন না আইনজীবী, তদন্তকারী সংস্থা এবং সরকার অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে জড়িত। আদালত নিজ থেকে কিছু দেখতে পারে না। আদালতকে যা দেখানো হয় তা দেখে আইনী বিষয়ে সমাধান করেন। বর্তমানে ধর্ষণ যে মহামারী ধারন করেছেন এর দায় বিচারের দীর্ঘসূত্রীতা এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এড়াতে পারে না। কিন্তু বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কিছু কারণ ইতিমধ্যে বর্ণনা করেছি এই সমস্যা সমাধানের সরকারকে অগ্রনি ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের বিচার ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর জন্য বিচারের পদের সংখ্যা, প্রয়োজনীয় আদালতের সংখ্যাসহ আনুসাঙ্গিক সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করা হোক এবং এবং মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই দাবিগুলোর জোরালো ভাবে সরকারের কাছে করা যেতে পারে। অথচ আমরা কি করছি! এদেশে বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ দমন হয়েছে তার নজীর নেই এমনতো বিষয় না। এই দেশে একসময়ে এসিড সন্ত্রাস ব্যাপক আকার ধারন করেছিল কিন্তু কঠোর আইন এবং আইনের বাস্তবায়নে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। তেমনি ভাবে বর্তমানে কঠোর আইন করা হোক অথবা প্রচলিত আইন সংশোধন করা হোক। আইনের শিক্ষার্থী হিসেবে প্রচলিত আইনে যেসব সংস্করণ আনা উচিত বলে আমার মনে হয়। যেমন বর্তমানে -নারী শিশু ও নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল -২০০০ আইনে ৯ ধারার উপধারা-১

👉ধর্ষনের শাস্তি যাবজ্জীবন এবং জরিমানা রাখা হয়েছে কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মৃত্যুদন্ড রাখা উচিত।

👉এই আইনের ধারা-১৮ তে অপরাধের তদন্তের কথা বলা হয়েছে কিন্তু অনেক সময়ে পুলিশ অবহেলার কারনে সঠিকভাবে তদন্ত হয় না। এতে করে অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। তাই এই মামলার তদন্ত পরিচালনা জন্য বিশেষ এক নিরপেক্ষ বাহিনী তৈরি করা উচিত। কেননা তদন্ত ঠিকমতো না হওয়ার কারণেই বিচার ব্যাহত হয়।

👉ধারা-২০ বিচার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে -এই ধারার উপধারা-৩ এ ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু ধর্ষনের প্রকোপ বেশি তাই এই সময় কমিয়ে ৯০ দিন রাখা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রচলিত আইনের সময় অনুসারে ১৮০ দিনের মধ্যে ও বিচার শেষ করা যায় না। এই সমস্যা সমাধান করতে হবে।

👉বর্তমানে নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল শুধু ধর্ষণ মামলা বিচার করেনা। অন্য আইনের মামলাও এই আদালত দেখে। যেমন- শিশু আইনের মামলা। এটা বন্ধ করা দরকার তাহলে আদালতের উপর বাড়তি চাপ কমবে। এতে করে ধর্ষণ মামলার কার্যক্রম তরান্বিত থাকবে।

পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই সাময়িকভাবে অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে এক্সটা জুডিশিয়াল কিলিং ধর্ষণ কমাতে সাহায্য করবে কিন্তু আদৌ এটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তবে উল্টো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতৃক সাধারণ মানুষের হয়রানির যে বাড়বে এটা নিশ্চিত বলা যায়। আমরা সবাই চাই ধর্ষণের কঠোর শাস্তি হোক এবং আইনি ফাঁকফোকরের মাধ্যমে কোন অপরাধী যেন ছাড় না পায়। স্বল্প সময়ে সঠিক বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ধর্ষন কমিয়ে আনা হোক, এটাই আমাদের জোরালো দাবি। বাংলাদেশের জন্য একটা সুন্দর সকালের অপেক্ষায় রইলাম যেদিন এদেশে কোন ধর্ষনের মত এত খারাপ অপরাধ থাকবে না।

লেখক- মো: রেজা -উর রহমান রাজু।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।