জেএসসি-এসএসসির গড় করে ফল: উৎকণ্ঠায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা

প্রকাশ: 10 October, 2020 2:16 : PM

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ‘অটোপাস’ পাওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা গভীর উদ্বেগ নিয়ে ফলের জন্য অপেক্ষা করছে। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত গ্রেডের ভিত্তিতে এই স্তরের ফল তৈরির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় এই ফল তৈরি করা হবে সেটি এখনও কারও কাছে স্পষ্ট নয়। এ কারণে নানা ধরনের প্রশ্ন ফিরছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। অনেকেই ‘বৈষম্যের’ শিকার হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ‘পরীক্ষাবিহীন এই ফল’ উচ্চশিক্ষা ও পরবর্তী চাকরিজীবনে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে সেটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের দুই পরীক্ষায় যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে তাদের চূড়ান্ত গড় ফল দেয়া সহজ হবে। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ দিলে আক্ষেপ হবে না। কিন্তু যারা এর নিচে বা কম জিপিএ পেয়েছিল, তাদের গড় কীভাবে তৈরি করা হবে সেটা বড় প্রশ্ন। কেননা অনেকেই ভালো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার লক্ষ্যে এইচএসসি পর্যায়ে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এখন ‘গড়’ ফলের শিকার হতে পারে তারা। আবার জেএসসি আর এসএসসি একইরকম পরীক্ষা নয়। জেএসসিতে কোনো বিভাগ নেই। সেটার সঙ্গে এইচএসসির কোনো তুলনাই হতে পারে না। জেএসসি থেকে শিক্ষার্থীকে কেবল বাংলা ও ইংরেজি বাদে অন্য বিষয়ে মূল্যায়নের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে বিষয়ভিত্তিক গ্রেড বা নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য ও সংকট তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে এসএসসিতে এক বিভাগে পড়া শিক্ষার্থী কলেজে আরেক বিভাগে চলে যায়। আবার মাদ্রাসা এবং কারিগরি বোর্ড থেকে যথাক্রমে দাখিল ও ভোকেশনালে এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষায় বা কলেজে ভর্তি হয়ে থাকে। এছাড়া পরীক্ষার্থীদের আরও দুটি গোষ্ঠী আছে। একটি অংশ হচ্ছে আগের বছর এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য এবং আরেক অংশ মান উন্নয়ন প্রার্থী। এই উভয় গোষ্ঠীকেও পাস করিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যে শিক্ষার্থী পরীক্ষাই দিতে পারেনি তার মান উন্নয়ন করে দেয়া হবে কোন প্রক্রিয়ায়। আর ফেল করা শিক্ষার্থীর গ্রেড নির্ধারণের উপায় হবে কী।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের সিদ্ধান্ত পরীক্ষা নিয়ে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা দূর করেছে। অতীতের দুটি পাবলিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে। তবে আরেকটি কাজ করা যেতে পারে। সেটি হচ্ছে, দু’বছর ধরে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন এবং নির্বাচনী পরীক্ষার ফলও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। যদিও মন্ত্রী বলেছেন, কাজটি কঠিন। তবু ভেবে দেখা যেতে পারে। এতে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেতে পারে।

আগের দুই পরীক্ষার ফলাফলের গড়ের মাধ্যমে এইচএসসির ফল নির্ধারণে আরও বেশকিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলে এসএসসি ও এইচএসসির প্রাপ্ত নম্বরের একটি অংশের গড় থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এইচএসসির প্রাপ্ত নম্বরের ৬০ শতাংশ এবং এসএসসির ৪০ শতাংশ নেয়া হয়েছে। কোথাও এইচএসসির ৩০ বা ২৫ শতাংশ আর এসএসসির যথাক্রমে ১০ ও ১৫ শতাংশ নেয়া হয়ে থাকে। অন্যদিকে বুয়েটসহ ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উচ্চতর গণিত ও জীববিদ্যার বিষয়ে গ্রেড নির্ধারণ করে দেয়া হয়। স্নাতকে সম্মান পড়তে বিষয়ভিত্তিক প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনা করা হয়। এসএসসির তুলনায় বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এইচএসসি স্তরে উল্লিখিত বিষয়ে বেশ গুরুত্ব দেন। কিন্তু সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, গড় নম্বর বা গ্রেড দেয়া হলে কেউ অতি মূল্যায়িত হবেন আবার কেউ অবমূল্যায়িত হবেন। এতে কেউ কেউ বঞ্চিত হতে পারে। এ কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কেউ কেউ সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এসব অসন্তুষ্টরা পরীক্ষায় বসতে চাচ্ছেন। সেটা সম্ভব না হলে ইংরেজি মাধ্যমের মতো ‘প্রেডিকটেড রেজাল্ট’ (সম্ভাব্য ফল) চেয়েছেন তারা।

দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী নামে একজন অভিভাবক বলেন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বা কলেজ যে পন্থা নিয়েছিল সেটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাতে ‘প্রেডিকটেড রেজাল্ট’ উল্লেখ থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশ যে ফল দিচ্ছে সেটাতে তো ‘প্রেডিকটেড’ লেখা যাবে না। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীর ট্রান্সক্রিপ্টে তাহলে কী লেখা হবে ‘আরোপিত’ বা ‘অটোপাস’। যে পন্থা নেয়া হয়েছে সেটা বৈজ্ঞানিক নয়।

বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮০ শতাংশই যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডেক্সেল’-এর শিক্ষার্থী। সংস্থাটির বাংলাদেশের প্রধান আবদুল্লাহ লিটন শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, মে-জুন সেশনের ‘এ’ এবং ‘ও’ লেভেল পরীক্ষার্থীদের ফল তৈরির ক্ষেত্রে বেশকিছু নীতি অনুসরণ করা হয়। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের নেয়া ‘মক টেস্ট’র (বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুতি পরীক্ষা) ফল বিবেচনা করা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে এই টেস্ট না নিতে পারলে ‘ক্লাস টেস্ট’ (বছরব্যাপী) বিবেচনা করা হয়। যদি এই টেস্টের ফলও কোথাও না পাওয়া গেছে সেখানে শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীর সম্ভাব্য প্রাপ্ত গ্রেড নেয়া হয়েছে। যেহেতু শিক্ষার্থীকে শিক্ষকই যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের পরীক্ষা বোর্ড এমন আরও কিছু গাইডলাইন দিয়েছিল। সেটার আলোকে গোটা বিশ্বেই এই নীতি অনুসরণ করে শিক্ষার্থীর ফল তৈরি করা হয়। এটাকেই ‘প্রেডিকটেড রেজাল্ট’ বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে শীর্ষপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, যে ভাষাই ব্যবহার করা হোক না কেন, মূলত এবার এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ‘অটোপাস’ দেয়ার ঘোষণাই এসেছে। বোর্ডের আইন অনুযায়ী এভাবে পার করে দেয়ার সুযোগ নেই। ন্যূনতম মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা দরকার ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জেএসসি পর্যায়ে সব শিক্ষার্থীকে একই বিষয় পড়তে হয়। অন্যদিকে এসএসসিতে বিভাগ আলাদা। আলাদা বিষয়ে পরীক্ষাও দিতে হয়। ফলে এইচএসসির সব ফল এই দুই পরীক্ষার গড়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া যে বয়সে শিক্ষার্থীরা জেএসসি পরীক্ষা দেয় সেই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এইচএসসির ফল নির্ধারণ করা যুক্তিসঙ্গত বা বিজ্ঞানসম্মতও নয়।

এ প্রসঙ্গে পরামর্শক কমিটির সদস্য সচিব ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ফলাফল নির্ধারণের নীতি ও কৌশল তৈরির কাজ করছে বোর্ডগুলোর কারিগরি কমিটি। সঙ্গে পরীক্ষা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরাও আছেন। আমরা পরামর্শক কমিটির বৈঠকে বসব। এর আগেই এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কাজ শেষ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরীক্ষার বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা শিক্ষার্থীদের গ্রেড দেব। সেটা নিয়েই তারা উচ্চশিক্ষায় যাবে। তাছাড়া তাদের উচ্চশিক্ষায় সুযোগ দেয়ার আগে আলাদা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়। সুতরাং এটা বড় কোনো প্রশ্ন নয়।

গেল ৭ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এইচএসসি পরীক্ষা সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন। তার সেদিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৩ লাখ ৬৬ হাজার পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করবে। সাধারণত এই স্তরে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষার্থী ফেল করে থাকে। এবার তারাও পাশের মুখ দেখবেন।

সুত্র: যুগান্তর