হোসেনি দালানে হামলা, আসামির বয়স জটিলতায় এগোয়নি বিচার

প্রকাশ: 30 August, 2020 11:58 : AM

আশুরার দিনটি মুসলিমদের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। শিয়া সম্প্রদায় এটি মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী হিসেবে বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালন করে থাকে।

দিবস উপলক্ষে অন্য দেশের ন্যায় ঢাকায় বের করা হয় তাজিয়া মিছিল। সেই তাজিয়া মিছিলের প্রাণকেন্দ্র পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে পাঁচ বছর আগে ভয়াবহ এক বোমা বিস্ফোরণ ঘটে।

হিজরি ১৪৩৭ সনের ৯ মহররম দিবাগত রাতে হোসেনি দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় নৃশংস এ বোমা হামলা হয়। খ্রিস্টিয় বর্ষ মোতাবেক ২০১৫ সালের ২৪ অক্টোবর ঘটে এই বিস্ফোরণ। তবে হিজরি সাল মোতাবেক শনিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এই ঘটনার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে।

হোসেনি দালানে হামলার ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনায় হওয়া মামলার বিচারে খুব বেশি অগ্রগতি নেই। দুই আসামি ঘটনার সময় অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন আসামিপক্ষের এমন দাবির পরই দেখা দেয় জটিলতা। প্রায় দুই বছর একই কারণে নতুন কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
এ ঘটনায় হওয়া মামলাটি বর্তমানে ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের আদালতে বিচারাধীন। সবশেষ ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ৪৬ সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।

এরপরই মামলায় কারাগারে থাকা আসামি জাহিদ হাসান ওরফে রানার আইনজীবী দাবি করেন, ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৭ বছর। এর সপক্ষে তারা জন্মসনদ, পরীক্ষার সনদ জমা দেন। আদালত সব কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ওই আসামিকে শিশু হিসেবে আখ্যায়িত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিতে বলেন।

গত বছর পুলিশ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দিলে ওই আসামির মামলা শিশু আদালতে পাঠানোর আদেশ হয়।

এরপর মাসুদ রানা নামে কারাগারে থাকা আরেক আসামির আইনজীবী তার আসামিকেও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ঘোষণা করে শিশু আদালতে বিচারের আবেদন করেন। সেই আসামির বিরুদ্ধেও সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের পর তার বিচার শিশু আদালতে স্থানান্তরের আদেশ হয়েছে বলে জানান ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারী রুহুল আমিন।

তিনি বলেন, এই মামলায় দুই আসামির বয়স নির্ধারণে জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। আদালতের নির্দেশে জটিলতা নিরসন হয়েছে। এই মামলায় পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য আছে।

দুই আসামির বয়স জটিলতা নিরসন হওয়ায় এখন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণে গতি আসবে বলে আশা করছেন ওই আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর গোলাম ছারোয়ার খান জাকির।

তিনি বলেন, অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় এই মামলার ১০ আসামির দুজনের বিচার হবে শিশু আদালতে। বাকি আটজনের বিচার এই আদালতে হবে। বয়স নিয়ে বিতর্ক ও করোনা পরিস্থিতির কারণে দুই বছর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। সেই জটিলতার অবসান হওয়ায় এখন সাক্ষ্যগ্রহণে গতি পাবে। ইতোমধ্যে কয়েকজন সাক্ষীর টেন্ডারের আবেদন করা হয়েছে। তারা আগের সাক্ষীদের বক্তব্য সমর্থন করায় তাদের জবানবন্দি গ্রহণের আর প্রয়োজন পড়বে না। সার্বিক বিবেচনায় মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ হওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ মামলার তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, কেমন তদন্ত হলো যে, সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার পর আসামির বয়স নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রকৃতপক্ষে এই আসামিরা ঘটনার সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে দায়সারা তদন্ত হয়েছে। আমরা আশা করছি আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন।

২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর রাতে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে আসেন শিয়া সম্প্রদায়ের ২০ থেকে ২৫ হাজার লোক। রাত পৌনে ২টার দিকে হোসেনি দালানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলায় সাজ্জাদ হোসেন ও জামাল উদ্দিন নামে দুইজন নিহত হন। আহতও হন শতাধিক।

ঘটনার দুইদিন পর পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের নামে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করে।

তদন্ত শেষে পরের বছর ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল ১০ জন জঙ্গির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্যই সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই হামলা চালায়।

এ হামলার মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত ১০ আসামি হলেন- মাসুদ রানা ওরফে সুমন, কবীর হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আসিফ, আবু সাঈদ ওরফে সালমান, আরমান ওরফে মনির, রুবেল ইসলাম ওরফে সুমন ওরফে সজীব, চান মিয়া, ওমর ফারুক মানিক, হাফেজ আহসানউল্লাহ ওরফে মাহমুদ, শাহজালাল ও জাহিদ হাসান ওরফে রানা।

এদের মধ্যে চারজন জামিনে আছেন। বাকিরা কারাগারে। জামিনে থাকা আসামিরা হলেন- ওমর ফারুক মানিক ও হাফেজ আহসান উল্লাহ মাহমুদ, শাহজালাল মিয়া এবং চান মিয়া।

আসামিদের মধ্যে জাহিদ, আরমান, রুবেল ও কবির আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এই হামলায় আরও তিনজনের নাম পাওয়া গেলেও তারা বিভিন্ন সময় বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। ওই তিনজন হলো- হিরন ওরফে কামাল, আলবানি ওরফে হোজ্জা ও আবদুল্লাহ ওরফে আলাউদ্দিন।

হোসেনি দালানে জঙ্গি হামলার এই মামলায় পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ২০১৭ সালের ৩১ মে ১০ জন জঙ্গির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত।

পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। এরপর মামলাটি গত বছরের ১৪ মে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।