করোনা মহামারীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন এসেছে

প্রকাশ: 14 August, 2020 10:58 : AM

সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, করোনা মহামারীতে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন এসেছে। এটা রাজনৈতিক স্থবিরতা নয়।

মহামারী বা দুর্ভিক্ষ বা দুর্যোগকালে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক দল ও শক্তিসমূহ নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরছে।

সরকার-প্রশাসনের ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে দিচ্ছে, সমালোচনা করছে, প্রয়োজনে প্রশাসনকে সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে। জাতীয় ঐক্য মানে সব রাজনৈতিক দলগুলোর একসঙ্গে বৈঠক করা না।

জাতীয় ঐক্য হচ্ছে যে কোনো জাতীয় সংকটে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করা। আমি মনে করি, করোনা মোকাবেলা বা বন্যার্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সকল রাজনৈতিক দল অভিন্ন অবস্থানেই আছে।

মহামারী বা দুর্যোগে রাষ্ট্র-প্রশাসন যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না, কোথাও ভুল-ত্রুটি-দুর্নীতি হচ্ছে কি না তা নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক সমালোচনা করা হলেও তা জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী কিছু না। বরং তা জাতীয় ঐক্যকে শক্তি জোগায়।

করোনার প্রকোপ কমে এলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এমনিতেই শুরু হয়ে যাবে। এটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব হাল ছেড়ে দিয়ে আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসে আছে, নাকি রাজনৈতিক নেতৃত্ব সজাগ থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছে সেটা দেখার বিষয়।

তিনি বলেন, করোনা মোকাবেলায় সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনা এখনও দূর হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা, বিনা চিকিৎসা বা উপযুক্ত চিকিৎসা ছাড়াই অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর তদন্ত হওয়া উচিত। এর দায়ভার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উল্টাপাল্টা কাজ, লোক হাসানো কথাবার্তায় খোদ সরকারের স্বাস্থ্যই খারাপ করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হাসানুল হক ইনু এসব কথা বলেন।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জাসদ। দলটির দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাসানুল হক ইনু। মহাজোটের হয়ে নির্বাচন করে একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছেন, ছিলেন তথ্যমন্ত্রী।

এখন একই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হাসানুল হক ইনু দেশের করোনাসহ নানান ইস্যুতে কথা বলেছেন।

হাসানুল হক ইনু বলেন, সমগ্র পৃথিবীর মতো বাংলাদেশও করোনা মোকাবেলায় অপ্রস্তুত ছিল। অপ্রস্তুত অবস্থা থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে করোনা মোকাবেলার কাজ শুরু হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যের বিষয় প্রধানমন্ত্রী যাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলেন তারা দায়িত্ব পালনে চরম অযোগ্যতা, ব্যর্থতা, গাফিলতির পরিচয় দিয়েছেন। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্ট হয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বড় বড় কর্মকর্তাকে বদল করেছেন, সরিয়ে দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য খাতে একর পর এক দুর্নীতির চিত্র প্রকাশিত হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, করোনা মহামারীর মধ্যেই জনস্বাস্থ্য সেবা খাতে যে দুর্নীতির চিত্র প্রকাশিত হয়েছে- তা অত্যন্ত ভয়াবহ, ভয়ঙ্কর, লোমহর্ষক। দীর্ঘদিন ধরেই জনস্বাস্থ্য সেবা খাত দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে।

জনস্বাস্থ্যসেবা খাতকে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতেই হবে। এ ব্যাপারে দল না দেখে মুখ না দেখে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত সবাইকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক-প্রশাসনিক আনুকূল্য ছাড়া দুর্নীতিবাজ-লুটেরা কিছুই করতে পারে না।

অসৎ রাজনীতিক-অসৎ আমলাদের ছায়াতেই দুর্নীতিবাজ-লুটেরা সুযোগ পায়। অসৎ রাজনীতিক-অসৎ আমলা-দুর্নীতিবাজ এই তিন গোষ্ঠীর মিলিত দুর্নীতির সিন্ডিকেটের ওপর বুলডোজার চালাতে হবে। আমার সুস্পষ্ট কথা দুর্নীতি পুষে রেখে করোনা মোকাবেলা করা যাবে না।

তিনি বলেন, ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’ নয়, দুর্নীতির আসল সাহেব-বেগমদের ধরতে হবে। দুর্নীতিবাজ-লুটেরাদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় এমন কেউই যেন নিজেদের আড়াল করতে না পারে তার জন্য কঠোর সাঁড়াশি চিরুনি অভিযান চালাতে হবে।

তিনি বলেন, করোনার মধ্যে বন্যা। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে বন্যা অস্বাভাবিক নয়। বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

করোনা মহামারী মোকাবেলা করা বা বন্যার্ত মানুষদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ভিন্নমত নেই। রাজনৈতিক দল বা শক্তিসমূহ পরস্পরবিরোধী কোনো প্রতিযোগিতায়ও লিপ্ত নেই। কেউ কাউকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েলও করছে না।

দেশের অর্থনীতি স্থবির প্রসঙ্গে প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, করোনা মহামারী সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও তীব্র আঘাত হেনেছে। স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিপণন-সেবা খাত পূর্ণোদ্যমে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন-আয়হীন হয়ে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ অভাবের মধ্যে পড়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধ করে অর্থনীতি সচল করা এবং কর্মহীন-আয়হীন হয়ে দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যে পতিত মানুষদের বাঁচানো হচ্ছে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

করোনা পুষে রেখে অর্থনীতি সচল করা কঠিন। তাই, ১. সর্বজনীন জনস্বাস্থ্য সেবা খাত গড়ে তুলতে হবে। একজন মানুষও যেন চিকিৎসাসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। ২. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। করোনায় আয়হীন-কর্মহীন-নিরুপায়-অসহায়-দরিদ্র-অভাবী সব মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আনতে হবে।

একজন মানুষও যেন অনাহারে না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য সহায়তা-নগদ অর্থ সহায়তার যে কর্মসূচি চালু হয়েছে তা অব্যবস্থাপনা-সমন্বয়হীনতা-দুর্নীতি-দলবাজিমুক্ত করতে হবে। ৩. খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ৪. জনস্বাস্থ্যসেবা খাতসহ সব ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজদের ধ্বংস করে দিতে হবে। সব ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

জাসদ সভাপতি বলেন, করোনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে জনগণের ভাগ্য ও দেশের ভবিষ্যৎ মুক্তবাজার অর্থনীতির ওপর ছেড়ে দেয়া যায় না। রাষ্ট্রকে জনগণের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। রাষ্ট্রকে মানবিক হতে হবে।

এ জন্য সংবিধানকে দুই মলাটের মধ্যে বন্দি না রেখে সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম ‘সমাজতন্ত্র’কে সংবিধানের পাতা থেকে মানুষের জীবনের পাতায় কার্যকর করতে হবে। ১. সর্বজনীন জনস্বাস্থ্যসেবা খাত গড়ে তোলা,

২. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা খাত গড়ে তোলা, ৩. সর্বজনীন খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ৪. সর্বজনীন শিক্ষা চালু করা ও ৫. ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন ব্যবহার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র-শাসন-প্রশাসন ব্যবস্থায় যে দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলো চিহ্নিত হয়েছে তা দূর করতে সংবিধান পর্যালোচনা করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি-খুনাখুনির পুরনো রাজনীতিকে কবর দিয়ে মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদা-অধিকার-মর্যাদার প্রশ্নকে রাজনীতির কেন্দে আনতে হবে।

করোনা মোকাবেলায় জাসদের ভূমিকা সম্পর্কে দলটির সভাপতি বলেন, মহামারী বা দুর্ভিক্ষ বা দুর্যোগ বা জাতীয় সংকটকালে রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় পরিবর্তন আসে।

মহামারী মোকাবেলায় বিশেষায়িত শক্তি অর্থাৎ চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী-প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী-আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী-সশস্ত্র বাহিনীকে সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে ভূমিকা পালন করতে হয়।

মহামারী মোকাবেলার জন্য জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও শক্তি নিয়ে এ সব বিশেষায়িত শক্তিই সম্মুখ কাতারের যোদ্ধা হন। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এসব বিশেষায়িত শক্তির সঙ্গে মিলে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হয়।

আমাদের দল জাসদের নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রশাসনের সঙ্গে থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সচ্ছল-বিত্তবানদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে অসহায়-নিরুপায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে।

আমাদের দলের নেতা-কর্মীরা সংক্রমণ রোধে জনগণকে সচেতন করার জন্য প্রচারণা চালানো, হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও সংগ্রহ করে বিতরণ, মাস্ক বিতরণ, অসহায় মানুষকে খাদ্য সহায়তা প্রদান, সংক্রমিত ব্যক্তির টেস্টের জন্য সহযোগিতা করা, রোগীদের হাসপাতালে পেঁৗঁছে দেয়ার জন্য সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছে, এখনও করে চলেছে।

সুত্র:যুগান্তর