‘ মরার পর যেন আবার জন্মগ্রহণ করি এই বরিশালের মাটিতে’- অশ্বিনী কুমার দত্ত

প্রকাশ: 28 July, 2020 6:23 : PM

সুশান্ত ঘোষ: পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তি সংগ্রামে অশ্বিনী কুমার দত্ত ছিলেন পুরোভাগে। বরিশালে বসেই তিনি কাপিয়ে দিয়েছেন বৃটিশ সাম্রাজ্যের ভিত। তখন পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫)স্থাপিত হয়নি। অশ্বিনী দত্ত একজন স্থানীয় গায়ক কে সঙ্গী করে বরিশালের বাজার রোড, হাটখোলা সহ জনবহুল এলাকায়, খাল ও নদীর ধারে গানের সংযোগে একটি কাঠের বাক্সের ওপর দাড়িয়ে সামাজিক,রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে বক্তব্য দিতেন। এভাবেই জনসাধারনের সভা নামে এক রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগ (১৮৮৬) পরবর্তিতে পরিণতি লাভ করে। অশ্বিনী দত্তের এই জনগণমুখিতা ছিল অসাধারণ। তিনি জাতীয় নেতা হতে পারতেন, কিন্তু তিনি চাইলেন বরিশালের মানুষের ভালো মন্দের সাথে জড়িয়ে আঞ্চলিক নেতা হয়ে থাকতে। তাই রাজনীতির সাথে জনসেবা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে বরিশাল কে বদলে দিতে চাইলেন। ১৮৫৩ সালে সরকারীভাবে বরিশাল জিলা স্কুল স্থাপনের পর শিক্ষার্থীদের ভীড়ে আরো একটি স্কুলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল । ১৮৮৪ সালের ২৭ জুন ‘সত্য-প্রেম-পবিত্রতা’ কে মহামন্ত্র করে পিতা ব্রজমোহন দত্তের নামে তিনি প্রতিষ্ঠিত করলেন ব্রজমোহন বিদ্যালয়। ‘ সত্য-প্রেম পবিত্রতা’ শুধু কাগজের বাণী ছিল না। বিদ্যালয়ের পতাকায়, প্রবেশ পথে, অধ্যয়ন- কক্ষে সর্বত্র এটি প্রচারিত হতো শুধু নয়, শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থেই ‘সত্য-প্রেম-পবিত্রতা’ ভাবনায় জীবনভর চালিত হতো। এমনকি বিদ্যালয়ে সঙ্গীতও ছিল- ‘ সত্য, প্রেম পবিত্রতা’- যেটি এ রকম- ‘ আয় ভাই আয় মাতি নব বলে/ এই মহাব্রত সাধিব সকলে;/ অদম্য উৎসাহে যতন করিলে,/ স্বরগ হইবে মরতধাম/
ঘৃণা অভিমানে দিব না বেদনা/ পশু পক্ষী কীট তাহারি রচনা;/ প্রচারি জীবনে দয়ার মহিমা,/ অহিংসা-মন্ত্র জপি অবিরাম।/
সত্যের নিশান তুলিয়ে গগনে/ পবিত্রতামৃত পূরিয়ে পরাণে./ প্রেম-ডোরে বাধি ভাই -বন্ধু গণে,/ চল পূর্ণ হবে যত মনস্কাম/ ( সংক্ষেপিত)

ব্রজমোহন বিদ্যালয় শুধু শিক্ষা গৃহ নয়, এখানে নীতি শিক্ষার উপর জোড় দেয়া হত। দরিদ্র -বান্ধব সমিতি, বান্ধব সম্মিলনী , এসব সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষক বৃন্দ ছাত্রদের নিয়ে, রোগীর সেবা, দরিদ্রকে সহায়তা ও বিপন্নকে উদ্বারের অবিরাম চেষ্টা করা হতো। স্কুলের শিক্ষাথীদের মধ্যে কেউ শিক্ষা কার্যক্রমে অর্থের অভাবে পড়াশুনা করতে না পারলে এগিয়ে আসতো ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ব্রজমোহন স্কুলের সুনাম তখন এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে তখন বাংলার কোন জায়গায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রয়োজন হলে এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের চেয়ে পাঠাত। শিক্ষা কার্যক্রমেও এই স্কুল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলে ওপরের দিকে অবস্থান করতো। এসব কারনে ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও ব্রজমোহন কলেজ( ১৮৮৯) দক্ষিণাঞ্চলে আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ব্রজমোহন কলেজের পরিবেশ এমন ছিল যে এক সময়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার হলে কোন গার্ড লাগতো না। ছাত্ররাই শিক্ষক রুমে গিয়ে প্রশ্নপত্র নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষকদের হাতে পরীক্ষার ফলাফল পৌছে দিতো। পঠন, চরিত্র গঠনে ব্রজমোহন কলেজের সুনামের কারণে এই কলেজ টিকে ‘অক্সফোর্ড অব বেঙ্গল’ নামে অভিহিত করা হতো। অশ্বিনী দত্ত শুধু মাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েই বসে ছিলেন না। ব্রজমোহন কলেজে তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে বিনা বেতনে ছাত্রদের ইংরেজিও পড়িয়েছেন। শিক্ষার্থীদের তিনি আপন সন্তান স্নেহের পরিচর্যায় গড়ে তুলেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠানে এমন সব শিক্ষক ছিলেন যারা সত্যে- আদর্শস্থানীয়, মানবপ্রেমে সিক্ত ও পবিত্রতার এক অনন্য মূর্তি।

১৯০৬ সালের ১৪ এপ্রিল বরিশালে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের তারিখ ঘোষিত হয়। হিন্দৃ মুসলামন মিলনের অগ্রদূত ব্যারিস্টার আবদুল রসুল ছিলেন সম্মেলনের সভাপতি। মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত ছিলেন অভ্যর্থনাা কমিটির সভাপতি। সম্মেলনে যোগ দিতে স্টীমারে আসেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, অরবিন্দ ঘোষ, ভূপন্দ্রকুমার বসু, যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী, কৃষ্ণ কুমার মিত্র, কালী প্রসন্ন কাব্য বিশারদ, মনোরঞ্জন গুহ ঠাকুরতা, লিয়াকত হোসেন, হেদায়েত বক্সী, ললিত মোহন ঘোষাল সহ অসংখ্য প্রতিনিধি। বর্তমানে অশ্বিনী কুমার হল এর স্থানটি ছিল রাজাবাহাদুরের হাবেলী। এখানেই সম্মেলন স্থান নির্ধারিত হয়। সারা দেশের নেতারা তখন অনুষ্ঠান স্থলে। মুকুন্দ দাস উদ্বোধনী সংগীত গাইলেন ‘‘ তরণ অরুণ কিরণে প্রকৃতি’’। কিন্তু সম্মেলন আর বেশীদূর চলতে পারলনা।ইংরেজ শাসকের আদেশ হলো ‘বন্দে মাতরম ’ধ্বনী করা যাবে না। এমনকি স্বেচ্ছাসেবকদের কুচকাওয়াজ ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ হলো। ’’তৎকালীন পুলিশ সুপানেটেনডেন্ট ক্যাম্প সাহেব সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জীকে আটক ও জরিমানা করে । তিনি সম্মেলনে এসে ঘোষণা দেন, রাস্তায় বন্দে মাতরম ধ্বনী সহ কোন শোভযাত্রা মিছিল না করলে সভা চলবে অন্যথায় সভা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু উপস্থিত সম্মেলনে আগত ডেলিগেটরা এই মুচলেকা দিতে অস্বীকার করলে সভা বন্ধ করার নির্দেশ দেন ক্যাম্প। বন্দেমাতরম উচ্চরিত হলো। অকস্মাৎ লাঠি বৃস্টি শুরু হয় পুলিশের। পুলিশ নির্মম ও বেপরোয়াভাবে ডাইনে ও বামে, সম্মুখে ও পশ্চাতে লাঠি চালাইতেছে। কেই রাস্তায় , কেই পথিপার্শ্বস্থ নর্দমায় পড়িয়া গেলেন রক্তাক্ত দেহে। যতীন বন্দ্যোপাধ্যায় গুরুতর আহত হলেন।কিন্তু লাঠির পর লাঠির আঘাতে মনোরঞ্জন হুহ ঠাকুরাতার পুত্র চিত্ত রঞ্জন পুকুরের মধ্যে পড়িয়া গিয়াও সংজ্ঞা লুপ্ত না হওয়া অবধি মাতৃমন্ত্রত্যাগ করেন নাই। বছরের প্রথম দিন ১লা বৈশাখ সেবক গন রক্তদীক্ষা গ্রহণ করিলেন বরিশালের রাজপথে। দেশ মাতৃকার শঙ্কাহরণ বরাভয় হস্ত সেদিন অন্তরীক্ষে উথ্থিত হইয়াছিল শত শত আহত সন্তানদের মাথায়’’ শ্রী হীরা লাল দাশগুপ্ত – জননায়ক অশ্বিনী কুমার’’
সম্মেলন বৃটিশ পুলিশের আকস্মিক লাঠিচার্জ সহ ঘোড়া উঠিয়ে দেয়ার ঘটনায় সম্মেলন পন্ড হয়ে যায়। নেতৃবৃন্দ, সাধারন ডেলিগেট ও বহু তরুন আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে।

কালীশচন্দ্র কবিতায় লিখলেন-‘ এই বরিশাল পূণ্যে বিশাল হল লাঠির ঘায়ে’।

১৯০৮ সালে বরিশালের বিখ্যাত স্বদেশ বান্ধব সমিতি কে ইংরেজ শাসক নিষিদ্ধ করে । অশ্বিনী দত্ত এই সমিতিরও সভাপতি ছিলেন। একই সাথে অনুশীলন সমিতি, ফরিদপুরের সুহৃদ, মংমনসিংহের ব্রতী এই সংগঠন গুলিকেও নিষিদ্ধ করা হয়। একই সাথে ১৮১৮ সালের ৩ নং রেজুলেশন দ্বারা আরও নয়জন নেতৃবৃন্দের সাথে অশ্বিনী দত্তকে ২ বছর বিনা বিচারে আটক রাখা হয়। শুধু তাই নয় সরকারী রোষানল ব্রজমোহন স্কুলের প্রতিও পরে । স্কুলের বৃত্তি বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে দেবপ্রসাদ ঘোষ ব্রজমোহন স্কুল থেকে এন্ট্রাশ পরীক্ষা দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১ম স্থান অধিকার করেও বৃত্তি হতে বঞ্চিতহলেন। দেব প্রসাদ এতেও হতোদ্যম না হয়ে ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হলেন। এমন কি একবার ব্রজমোহন কলেজের আর্থিক অবস্থা সঙ্গীন হলে সরকারী সহায়তার জন্য আবেদন করা হলে, ইংরেজ সরকার পাচ শিক্ষকের একটি তালিকা ধরিয়ে দেয়। এদরকে কে বহিস্কার করলেই মিলবে সরকারী সহায়তা। অশ্বিনী দত্ত অস্বিকার করলেন এই সহায়তা। উল্লেখ্য এই পাচ শিক্ষক ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও দেশ প্রেমিক শিক্ষক। তারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে পরে কলেজটিকে বাচাতে পদত্যাগ করেন।

অশ্বিনী দত্তেরর প্রভাবে যারাই এসেছেন, দেশপ্রেমিক সোনার মানুষে পরিণত হয়েছেন। এর প্রধান উদাহারণ যজ্ঞেশ্র কে তিনি চারণ কবি মুকুন্দ দাস রুপে গড়ে তোলে যাত্রার মাধ্যমে লোক শিক্ষার আহবাান জানান। অশ্বিনী দত্তের ভাষায় – ‘ আমরা যে সব বক্ততা করে বেড়াচ্ছি তা যদি কেউ যাত্রা আকারে গ্রামে গ্রামে প্রচার করে, তাহলে তা আমাদের এই রুপ সভা বা কক্ততার চেয়ে অনেকটা কার্যকরী হয়’। মুকুন্দ দাস নেমে পরলেন দেশের কাজে । গ্রামে গ্রামে মুকুন্দের যাত্রাপালার মাধ্যমে স্বদেশ চেতনার জাগরণের ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল। বৃটিশরাজ প্রমাদ গুণলেন। যেখানেই মুুকুন্দ দাস সেখানেই ১৪৪ ধারা ঘোষিত হল। তারা বই বাজেয়াপ্ত হল- এক সময়ে গ্রেফতার করল তাকে।

অশ্বিনী দত্তের প্রেরণায়-স্বদেশ জাগরণে মুকুন্দ তখন আহবান ধরেছে-‘ আয় রে বাঙালি আয় সেজে আয়/ আয় লেগে যাই দেশের কাজে।/ দেখাই জগতে ভেতো- বাঙালী. দাড়াইতে জানে বীর সমাজে/’

অশ্বিনীর নির্দেশে,মন্ত্রশিষ্য মুকুন্দ দাসের যাত্রা পালায় বৃটিশ ভিত অনেকটাই কেপে উঠলো। বরিশাল হলো বৃটিশ রিরোধিতার অন্যতম কেন্দ্র। বরিশাল ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিলো।

১৯২১ সালে বরিশালে কংগ্রেসের আরেকটি প্রাদেশিক কনাফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধী সে সময়ে আসতে না পারলে পরের বছর তিনি জনসভা করেন। এসময় অশ্বিনী দত্তেরর বাসভবনেও তিনি মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের সাথে দেখা করেছেন বলে বিভিন্ন বই পত্রে উল্লেখিত রয়েছে। সে সময়ে বরিশালের বৃটিশ বিরোধিতা ছিলো সারা ভারতবর্ষের মতো প্রবাদ সম।মহাত্মা গান্ধীর উচ্চারণে-‘সমগ্র ভারত যখর গভীর নিদ্রায় মগ্ন তখন বরিশাল সদা জাগ্রত’

রাজাবাহাদুর হাভেলীর এই রক্তাক্ত স্মৃতি, যেখানে জনগনের কথা বলবার স্থান এই স্থানটিকে জনগনের চিরতরে কথা বলার স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে একটি হল স্থাপনের উদ্যোগ নেন অশ্বিনীকুমার। শের-ই বাংলা ফজলুল হক সহ অনেক দানশীল ব্যাক্তি ও সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগে যুক্ত হলে শুরু হয় হল নির্মাণ কাজ। কিন্তু হল নির্মাণের ২ বছরের মধ্যে অশ্বিনী দত্ত ১৯২৩ সালের ৭ নভেম্বর মারা গেলে পরবর্তীতে নাগরিক বৃন্দ এই হলটির নামকরণ অশ্বিনী দত্তের স্মৃতির প্রতি সম্মানজানিয়ে অশ্বিনী কুমার হল নামকরণ করে।
১৯২৩ সালে অশ্বিনী দেেত্তর মৃত্যুর পরে তার ভায়ের ছেলে সরল দত্ত অশ্বিনী ভবনে অবস্থান করেন। ১৯৫০ সালে পাকিস্তানে প্রতিরক্ষা আইনে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মত তাকেও পুলিশ গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে কিছুদিন পরে তিনি কলকাতায় চলে গেলে মৌখিক ভাবে ব্রজমোহন কলেজকে বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষনের জন্য দিয়ে যান। এসময় এখানে অশ্বিনী কুমার কসমোপলিটন হোম নামে সব ধর্ম ও বর্ণের জন্য একটি ছাত্রাবাস চালু হয়।

জন নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহম্মেদ ব্রজমোহন কলেজে পড়াকালীন এই ছাত্রাকাসেই থাকতেন। ১৯৬৩ সালে দি বরিশাল নাইট কলেজ অস্থায়ী ভাবে ব্রজমোহন স্কুলে শুরু হয়। এই কলেজের বেশীর ভাগ শিক্ষার্থীরা ছিল বরিশাল কালেকটরেট এর কর্মাচারী বৃন্দ। অনেকেই এই কলেজ থেকে পাশ করে দ্রুত উচ্চ পদে আসীন হতে পেরেছিলেন। ১৯৬৬ সালে এই কলেজটি বরিশাল কলেজ নাম দিয়ে দিবা শাখা চালু করে অশ্বিনী দত্তের বাসভবনে। ১৯৮৬ সালে যা সরকারী করণ করা হয়। ১৯৬৩ সালে নাইটকলেজ প্রতিষ্ঠাকালে এটিকে অশ্বিনী কুমার কলেজ নামে নামকরণের প্রস্তাব দেন, তৎকালীন ন্যাপ ও পরবর্তীতে মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত। কিন্তু তখন উদ্যোক্তাদের অনেকেই মুসলিম লীগের রাজনীতির ধারক থাকায় তা প্রত্যাখাত হয়। পরবর্তীতে বলেজের গর্ভনিং বডির সম্পাদক, বিশিষ্ট আইনজীবী , বর্তমানে অওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন কলেজ টির নাম অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে করার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হন। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস একই প্রস্তাব সংসদে উথ্থাপন করে কলেজের নামকরণ অশ্বিনী দত্তের নামে করার প্রস্তাব করেন। বাটাজোর অশ্বিনী কুমার ইনস্টিটিশনে ১৯৯৬ এর পরবর্তী সময়ে অশ্বিনী মেলায়, তৎকালীন চীফ হুইপ আবুল হাসানাত এর উপস্থিতিতে কলেজটিকে অশ্বিনী দত্তের নামে নামকরনে প্রস্তাব জানায় উদ্যোক্তারা।

বিগত ২ বছর ধরে ‘মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত স্মৃতি সংসদ’ ধারাবাহিক ভাবে অশ্বিনীমেলা উপলক্ষে জেলা প্রশাসক বরাবরে এই আহবানে স্মারকলিপিও প্রদান করে, যা গত ১৯ ফ্রেবুয়ারী জেলা প্রশাসক প্রস্তাবটিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডকে এ বিষয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি প্রদান করার নির্দেশ দিলেই প্রথমে একদল হৈ চৈ শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক মন্তব্য উচ্চারিত হতে থাকে। পরবর্তীতে সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদের ব্যানারে মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠে সোচ্চার হয়। পরবর্তীতেবিভিন্ন সামাজিক , রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিয়ে গঠিত হয় ১০১ সদস্য বিশিষ্ট অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে বরিমাল কলেজ বাসবায়ন কমিটি। এ ছাড়া বাসদও কলেজের নামকরন অশ্বিনী দত্তের নামে নামাকরণের পক্ষে সরব হয়। এ বিষয়ে পাল্টা পাল্টি অবস্থান, সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরকারী দলের প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ এখন বরিশালের প্রধান আলোচিত বিষয়। সুযোগ বুঝে ইসলামী শাসন তন্ত্র আন্দোলনও বিভিন্ন কর্মসূচী দেয়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উত্তেজনায় মোড় নেয়। একটি কলেজের নামকরণ ঘিরে বরিশালের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান কারো কাম্য হতে পারে না। অশ্বিনী দত্ত বরিশালের মহান নেতা। তার স্মৃতি রক্ষায় তার বাসভবনে কোন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ এটি কোন অন্যায় বা অন্যায্য দাবী নয়। তার বাসভবনে তার স্মৃতি রক্ষা এটি সময়ের দাবী- তা নাহলে আমরা অকৃতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত লাভ করব সর্বত্র। অশ্বিনী দত্ত নিজেও বরিশালের প্রতি ভালবাসায় ছিলেন অকুন্ঠ- তাইতো তিনি অনুরাগে বলেন ‘ মরার পর যেন আবার জন্ম গ্রহণ করি এই বরিশালের মাটিতে’’

 

লেখক: সুশান্ত ঘোষ, সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক