অশ্বিনীর প্রাপ্যটা সবচেয়ে ভালো বুঝবে সেরনিয়াবাতের বংশজরা

প্রকাশ: 14 July, 2020 6:09 : PM

শরীফ খিয়াম আহমেদ ঈয়ন: বরিশালের ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নগরপিতা ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতির জীবন্ত কিংবদন্তি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এই জেষ্ঠ্য কার্য নির্বাহী সদস্য এবং জেলা কমিটির সভাপতি যখন ১৯৭৩ (মতান্তরে ১৯৭৪) সালে পৌরসভা চেয়ারম্যান হন, তখন তাঁর মামা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন; আর পিতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত ছিলেন ভূমি প্রশাসন, ভূমি সংস্কার ও ভূমি রাজস্ব এবং বন্যানিয়ন্ত্রণ, পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী; সাথে আরো অনেক স্বজন এবং আস্থাভাজনরা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সব সরকারি দায়িত্বে। যদিও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সরকার দলীয় প্রার্থী জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীরকে হারিয়েই মাত্র ২৬ বছর বয়সে স্বাধীন দেশে বরিশালের প্রথম পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন হাসানাত। তাঁর সুযোগ্য সন্তান সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ২০১৮ সালে যখন বরিশালের নগরপিতা নির্বাচিত হন, তখন টানা ১০ বছর ধরে শক্ত হাতে দেশ শাসন করছেন তাঁর ফুপু বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; বাবাও মন্ত্রী মর্যাদার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহবায়ক পদে আসীন; একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। পরে ২০১৯ সালের সম্মেলনে সাদিক বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

দৃশ্যত প্রবাদ প্রতিম জননেতা শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারই এখন দক্ষিণবঙ্গের অঘোষিত অভিভাবক; যে পরিবারের অতীতের ত্যাগের সাথে জড়িয়ে আছে দেশের জন্মের ইতিহাস। তাদের শহরের বাসাও কালীবাড়ি রোডে, সরকারি বরিশাল কলেজ থেকে সদর রোডের দিকে একটু আগালেই। যে কারণে এটিকে তাদের ‘দুয়ার ধারের’ বা মহল্লার কলেজও বলা যেতে পারে। ১৮৮৪ সালে মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রতিষ্ঠিত ব্রজমোহন স্কুল আর ১৯২৭ সালে জগদ্বীশ বাবু প্রতিষ্ঠিত জগদ্বীশ স্বারসত বালিকা বিদ্যালয়ও একই এলাকায় কলেজটির দুই দিকে কদম দুরত্বে অবস্থিত। সবমিলিয়ে শহরের এই এলাকাটি শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অনেক আগে থেকেই বেশ এগিয়ে।

এত ভাবনার অবতারণা মূলত অশ্বিনী কুমার দত্তের বাড়িতে গড়ে ওঠা ওই বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তনে জটিলতা তৈরী হ্ওয়ার কারণে। শেষ অবধি মনে হয়েছে, বিষয়টিকে বরিশালের অভিভাবকদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। নিশ্চয়ই শ্রদ্ধেয় আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ-ই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটি নিতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারবেন। কারণ নিঃসন্দেহে তারা দরদী জননেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাতের যোগ্য উত্তরসূরী। ভূমিমন্ত্রী হিসেবে যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার পরিমাণ ১০০ বিঘায় সীমাবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন; মৃত্যুর পর যার ব্যাংক একাউন্টে মাত্র ৩১৪ টাকা পাওয়া গিয়েছিল; তাঁর আদর্শের অনুগামী যে কেউই বুঝবেন জনহিতৈষী মহাত্মা অশ্বিনীকে কতটুকু সম্মান দেওয়া উচিত বা কতটুকু তাঁর প্রাপ্য। বরিশাল পৌরসভার কমিশনার, ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যানের দায়িত্বপালন করা স্বদেশী আন্দোলনের এই নেতাকে তারা আমাদের চেয়ে কম চেনেন না। তাছাড়া গুণীর কদর যে শুধু গুণীজনই করতে পারে।

আমার বিশ্বাস, শুধুমাত্র এই পিতা-পুত্র, মানে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ চাইলে মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত সরকারি কলেজ নাম করণে কেউ বাঁধা তৈরীর সাহস পাবে না। এ নিয়ে সাম্প্রদায়িক ‘গুটিবাজি’ করেও সুবিধা করতে পারবে না কেউ। এই পরিবারে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিকজনদের আশ্রয়স্থল ছিলেন গত ৭ জুন প্রয়াত শাহান আরা আবদুল্লাহ। মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে সন্তান হারানো প্রত্যক্ষদর্শী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি হাসানাতের স্ত্রী এবং সাদিকের মা। তাঁর মৃত্যুর একমাস না যেতেই বরিশালের সুযোগসন্ধানী প্রতিক্রিয়াশীলরা যেভাবে নির্বিঘ্নে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা লজ্জাস্কর।

অশ্বিনী কুমারের জন্মস্থান গৌরনদীর বাটাজোর থেকে রব সেরনিয়াবাতের গ্রাম আগৈলঝাড়ার সেরালের দুরত্ব কিন্তু খুব বেশী নয়। অশ্বিনীর মৃত্যুর মাত্র দুই বছর আগে জন্মালেও রবকে চেতনার দিক দিয়েও তাঁর খুব বেশী দূরের মানুষ মনে হয়নি কখনো। তাদের দুজনেই সাদামাটা জীবন যাপন করে গেছেন। একজন স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, অপরজন কৃষক আন্দোলনে। তাছাড়া দুজনেই একেশ্বরবাদী ছিলেন; একজন ইসলাম, অপরজন ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী। আপাতত এটুকুই বলার ছিল।

লেখকঃ সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক